অভ্রঃ বাংলা ভাষার রূপকথার নাম!

বিজয়ের সাথে তখন সবার পরিচিতি। বিজয় নামের কোন তরুন নয়, বলছি বিজয় কী-বোর্ডের কথা। লিখতে একটু কঠিন বটে, তবে কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করতে গেলে বিজয় কী-বোর্ড শেখাটা যেন খুব দরকারি হয়ে পড়েছিলো। বিজয় ব্যবহার করতে গেলে প্রয়োজন পড়তো অনুশীলন এবং দক্ষতার। সেসময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের এক ছাত্রের মাথায় ঘুরছিলো ভিন্ন কিছু করার চিন্তা। বাংলাকে সহজভাবে লেখার চিন্তা।

নিজের এই যুগান্তকারী আইডিয়ার জন্য কত দাম চেয়েছিলেন মানুষটি? এক পয়সাও না। অবাক হয়ে বাকিরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো- ‘কেন?’

মানুষটি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন- “ভাষার জন্য টাকা নেবো কেন?”

বলছিলাম বাংলা লেখার সফটওয়্যার ‘অভ্র’ নির্মাণ করা মেহদী হাসান খানের কথা। এই গল্পটা বেশ পুরনো। তবে অনেকসময় গল্প যতটাই পুরনো হোক না কেন, তার মূল্যটা যেন ঠিক একইরকম থেকে যায়। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। অভ্র তৈরীর গল্পটাও ঠিক এমন। 

অভ্র কী?

কিছুটা হলেও বাংলা ব্যবহার করেন যারা তাদের কাছে অভ্র খুব পরিচিত একটি নাম। এই কী-বোর্ড ব্যবহার করে ইংরেজির মাধ্যমে বাংলা লেখা সম্ভব হওয়ায় মানুষের পক্ষে বাংলায় কাজ করাটা অনেক বেশি সহজ হয়ে পড়েছে। আগে থেকে কোন অনুশীলন বা জ্ঞান না থাকা স্বত্ত্বেও নিমেষেই বাংলা লিখতে পারছেন মানুষ অভ্র সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে। 

অভ্রের ইতিহাসঃ এক রূপকথার নাম!

প্রায় দশ বছর ধরে খাটাখাটনির পর একটি সফটওয়্যার তৈরি করতে পেরেছিলেন শিক্ষার্থী মেহদী হাসান খান।  সফটওয়্যারটির নাম দিলেন অভ্র। কেন এমন একটা কাজ করতে গেলেন তিনি? এই রূপকথার শুরুটা হয়েছিলো ২০০৩ সালে। সেবার ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বইয়ের পাশাপাশি ছিলো বাংলা ইনভেনশ থ্রু ওপেন সোর্স, সংক্ষেপে বায়োসের একটি স্টল। সেখানে লিনাক্সের বাংলা ভার্সন- বাংলা লিনাক্স প্রদর্শন করছিলেন আয়োজকেরা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উইন্ডোজের টাইটেল, মেন্যু এবং ফাইলের নাম বাংলায় লেখা সম্ভব হচ্ছিলো। সেসময় বাংলা লেখার কীবোর্ড খুব একটা সহজ না হওয়ায় এই সিস্টেম বায়োস সবার মনযোগ আকর্ষণ করেছিল। আর বায়োসে মুগ্ধ হওয়া এমনই এক দর্শক ছিলেন মেহদী হাসান খান। 

প্রোগ্রামিং নিয়ে বেশ আগ্রহ ছিলো তার। সেবার সেই যে বায়োস দেখলেন মেহদী, এরপর তার মাথায় পাকাপাকিভাবে ঢুকে গেলো বাংলা লেখার সফটওয়্যার তৈরীর পোকা। তবে মেহদীর স্বপ্ন পূরণ করতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। সে বছরই মুক্তি পায় অভ্র।

এই পথচলা অবশ্য খুব একটা সহজ হয়নি। বাড়িতে এসে লিনাক্স নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন মেহদী হাসান। তবে তার কম্পিউটার উইন্ডোজে বাংলা লিনাক্স ব্যবহার করা যাচ্ছিলো না কোনভাবেই। শেষমেশ অবশ্য কম্পিউটারে সফটওয়্যারটি ইন্সটল করেন তিনি। আর তখনই খুব অদ্ভূত একটি ব্যাপার খেয়াল করেন তিনি। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড কী-বোর্ডের ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে মেহদী সহজেই বাংলায় লেখার উপায় বের করে ফেলেন। কিন্তু তারপরেও ব্যাপারটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছিলো। বাংলা, মায়ের ভাষায় লেখা এতো কঠিন কাজ হলে চলে? একদম নয়! তাই নতুন উদ্যোমে, নতুনভাবে বাংলা সহজে লেখার উপায় খুঁজতে শুরু করেন তিনি। 

একদম নতুন একটি কী-বোর্ড তৈরী করার কাজে নেমে পড়েন মেহদী। একদিকে মেডিকেল কলেজের পড়াশোনা, অন্যদিকে নিজের শখের দিকে এই ছোটাছুটি। সময় যেন উড়ে যাচ্ছিলো মেহদীর। সময়ও পাওয়া যাচ্ছিলো না ঠিকঠাকভাবে। একটা সময় অবশ্য এই কঠোর চেষ্টার ফলাফল পাওয়া গেলো। একটি প্রোটোটাইপ তৈরী করে ফেললেন মেহদী। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। বাঁধলো আরেক ঝামেলা। উইন্ডোজের জন্য মাইক্রোসফট ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রথম সফটওয়্যার তৈরী করেছিলেন মেহদী হাসান খান। কিন্তু, অন্য স্থানে ব্যবহার করতে গেলে বারবার এই কী-বোর্ড ক্র্যাশ করছিলো। 

ডটনেট বাদ দিয়ে এরপর ক্ল্যাসিক ভিজ্যুয়ালের উপরে আবার প্রোটোটাইপ তৈরি করেন তিনি। তারপর? তারপর হুট করেই যেন সবটা কাজ শেষ হয়ে গেলো। তৈরি হয়ে গেলো মেহদী হাসান খানের এতোদিনের চেষ্টার ফল, বাংলা কী-বোর্ড অভ্র। 

অভ্র তৈরি করার কাজটি কিন্তু মেহদীর জন্য শুধু একটি সফটওয়্যার তৈরির ব্যাপার ছিলো না। একইসাথে যেন অভ্র সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় সেটা নিশ্চিত করতে ওমিক্রন ল্যাব নামক একটি ওয়েবসাইট নির্মাণ করেন মেহদি হাসান খান। সেটার জন্য চলে তার বাড়তি আরেক যুদ্ধ। নিয়মিত ক্লাস করে বা না করে নিজের এই ওয়েবসাইটের জন্য কাজ কর যাচ্ছিলেন মেহদী হাসান খান। শিক্ষক, পরিবার, বন্ধু বা বড় ভাই- সবাই একটা সময় অতীষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। আসলেই তো, কী করছে ছেলেটা পড়াশোনা আর বন্ধুবান্ধব্দের এড়িয়ে? সবার কাছ থেকে একরকম দূরে সরে গিয়ে? কোন কথাই অবশ্য গায়ে লাগাননি এই ভাষার জাদুকর। দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট করে গিয়েছেন। অবশ্য শেষমেশ ওমিক্রন এবং অভ্র দুটোই একসাথে গড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে সবার কাছে অভ্রকে পৌঁছে দিতে ওমিক্রন ল্যাবকে দিনকে দিন আরো বেশি সহজ করে তোলার চেষ্টা করেন মেহদী। চলে আপডেট দেয়া, ম্যানুয়েল লেখা আর ভার্সন নম্বর বাড়ানোর কাজ। মেহদীকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলো সবাই। তবে সবার প্রশ্নের যুতসই জবাব দেন মেহদী যখন তার কাজ আর অভ্রকে নিয়ে কম্পিউটার টুমরো নামের একটি মাসিক ম্যাগাজিন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

তবে মেহদী একা নন, তার সাথে কাজ করেন আরো অনেকেই। অভ্রর ম্যাক ভার্সন প্রস্তুতকারী রিফাত উন নবী, অভ্রর কালপুরুষ ও সিয়াম রুপালী ফন্টের জনক সিয়াম, অভ্রর বর্তমান ওয়েবসাইট ও লিনাক্স ভার্সন প্রস্তুতকারী সারিম, ভারতের নিপন এবং মেহদীর সহধর্মিনী সুমাইয়া নাজমুন- এমন আরো অনেকে ছিলেন এই পথে মেহদীর সাথে।

অভ্রের স্লোগান মেহদী রেখেছিলেন- ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’। আসলেই তিনি চেয়েছিলেন বাংলা ভাষা যেন সবখানে ছড়িয়ে যাক। এখন অবশ্য হয়েছেও তাই। নিজের সফটওয়্যারের নাম তিনি রেখেছিলেন অভ্র বা আকাশ। আর এখন, ২০২০ সালে এসে অভ্র সত্যিই বাংলাদেশের সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই এখন বিজয় নয়, বরং অভ্রকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। 

মেহদী হাসান খান কখনোই প্রচার চাননি। তবে নিজের কাজের সাথে সাথে আলোচিত হয়েছেন তিনিও। অভ্র পেয়েছে দারুণ প্রচার এবং সম্মান। অভ্রকে বাংলা কিবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েবসাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও মাইক্রোসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে অভ্র কিবোর্ডকে। বিশেষ অবদানের জন্য অভ্র টিম পেয়েছে বেসিস বাংলা থেকে স্পেশাল কন্ট্রিবিউশন অ্যাওয়ার্ড। ২০১৬ সালে মেহদী হাসান খান টপ টেন আউটস্ট্যান্ডিং ইয়ং পার্সনের একজন হিসেবে নির্বাচিত হন। 

সবচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এতো বড় অবদানের পরও এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোন স্বীকৃতি পাননি এই মানুষটি। নিজের মতো কাজ করে গিয়েছেন তিনি। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকারি দপ্তরেও অভ্রকে বাংলা লেখার মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর থেকে বাড়তি কিছুই আজো আমরা এই মানুষটিকে দিতে পারিনি।

চিকিৎসা নিয়ে পড়েছেন তিনি। হয়তো পড়াশোনাকেই সবার আগে বেছে নিলে চিকিৎসক হতেন। তবে পড়াশোনা শেষ করলেও সেটা ব্যবহার না করে নিজের মনের কথা শুনেছেন মেহদী হাসান খান। প্রোগ্রামিংকে ভালোবেসে এখনো পর্যন্ত এই ক্ষেত্রেই কাজ করে চলেছেন তিনি।

বাংলা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছিলেন জব্বার, বরকত, সালামসহ আরো অনেকে। আমরা আজ যে বাংলা ভাষা বিনা দ্বিধায়, বিনা ভয়ে বলতে পারছি, তার পেছনে অবদান রয়েছে এই মানুষগুলোর। নিজেদের জীবনের দামে আমাদের মুখের ভাষাকে ছিনিয়ে এনেছেন তারা। মেহদী হাসান খানের অবদানটাও খুব একটা কম নয়। বাংলা ভাষা যদি আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এতো সহজে লিখতে পেরে থাকে, তাহলে তার পেছনে এছেন একজন মেহদী হাসান খান। মানুষটিকে এতোটুকু সম্মান তো আমরা দিতেই পারি, তাই না?

লেখকঃ সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …