অলিম্পিক গেমস : শতবছরের বিবর্তনের ইতিহাস olympic games history

বিশ্ব জুড়ে উন্মাদনার অন্য নাম অলিম্পিক গেমস ৷ প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর অনুষ্ঠিত হওয়া এই বিশাল ক্রীড়াযজ্ঞের বর্তমান অবস্থা, গত এক শতকেরও অধিক সময়ের বিবর্তনের সারচিত্র ৷ শুরুর দিকের অলিম্পিক গেমস কেমন ছিল, এতে কারা কারা অংশ নিত কিংবা কোন উদ্দেশ্যে অলিম্পিক গেমসের প্রচলন শুরু হয়েছিল তা খেলাধূলা প্রেমীরা হয়তো জানেন। তবে এখনো এই উন্মাদনার ইতিহাস অনেকেরই অজানা। এই সময়ের  অলিম্পিক গেমস অতীতে কোন ধরনের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে, আসুন তা জেনে নেই।

প্রাচীন গ্রীসে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৭৬ সালে শুরু হওয়া অলিম্পিক গেমস নিয়ে পৌরণিক কাহিনীর ছড়াছড়ির শেষ নেই ! তবে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটি হোলো- গ্রীক দেবতা জিউসের আবাসস্থল অলিম্পিয়ার রীতিনীতি মেনে অলিম্পিক গেমসের সূচনা করেছিলেন তার পুত্র হারকিউলিস ৷ হারকিউলিসই প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর এই খেলার নিয়ম চালু করেছিলেন ৷ শুধুমাত্র গ্রীস নগর রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের ভেতর সীমাবদ্ধ এই খেলাটি তৎকালীন মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল মূলত দুটি কারনে ৷ প্রথমত, খেলা উপলক্ষ্যে জনউন্মাদনার বিষয়টি এবং দ্বিতীয়ত অলিম্পিক গেমস চলাকালীন পারস্পারিক নগর রাষ্ট্র বিষয়ক কোন্দল বন্ধ থাকা ৷ “অলিম্পিকের যুদ্ধবিরতি নীতি” নামে খ্যাত একটি মতবাদে বিশ্বাসী গ্রীকরা মনে করত অলিম্পিক গেমস দেখতে অলিম্পিয়ায় যাওয়া তীর্থ যাত্রীদের সাথে স্বয়ং দেবতা জিউস অবস্থান করেন। তাই গেমস চলাকালীন সময়ে সব ধরনের হানাহানি বন্ধ থেকে একটা শান্তি ও উৎসবের পরিবেশ বিরাজ করত সমগ্র গ্রীস জুড়ে ৷

বারোটি বিখ্যাত অভিযান শেষ করে হারকিউলিস তার পিতা জিউসের সম্মানে একটি স্টেডিয়াম তৈরি করেন ৷ সেখানেই অলিম্পিয়ার রীতিনীতি মেনে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হত প্রতি চার বছর পর পর ৷ দৌড় প্রতিযোগীতা, মল্লযুদ্ধ, মুষ্ঠিযুদ্ধ, ঘোড়দৌড়ের মত প্রতিযোগীতায় এই ক্রীড়াযজ্ঞ সীমাবদ্ধ ছিল ৷ এই চার বছর সময়কে বলা হয় “অলিম্পিয়াড”, যা প্রাচীন গ্রীকদের সময় পরিমাপের একক হিসেবে ইতিহাসে লেখা রয়েছে ৷ 

তখনকার যুগে অলিম্পিক বিজয়ীদের পুরস্কার হিসেবে বস্তুগত কোন কিছুর উল্লেখ না থাকলেও তাদের সম্মানে রচিত গান-কবিতা-স্তুতি গাঁথাই বলে দেয় সেই যুগে সমাজে তারা কতটা প্রভাবসম্পন্ন ছিলেন ৷ খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতকের তুমুল জনপ্রিয়তার পর আস্তে আস্তে গ্রীসের চেয়ে রোমের শক্তিশালী হবার প্রভাব একটা সময় অলিম্পিক গেমসের উপরও এসে পড়ে ৷ সঠিক সময় জানা না গেলেও ধারনা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৩ সালে থিওডোসিয়াসের শাসনামলে পৌত্তলিকতার দায়ে এই খেলা বন্ধ হয়ে যায় ৷ তারপর সেখান থেকে প্রায় অনেক বছর পর আধুনিক অলিম্পিকের ধারনার উদ্ভব হয় সতের’শ শতাব্দির ইংল্যান্ডে ৷ এরপর ফ্রান্স,ইংল্যান্ড,যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই ধীরে ধীরে প্রাচীন অলিম্পিক গেমসের আদলে ক্রীড়া প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হত ৷ ১৮৬০ সালে ইংল্যান্ডের নাগরিক ড. ব্রুস এবং উইলিয়াম পেনির সমন্বয়ে তৈরি হয় “ওয়েলনক অলিম্পিয়ান সোসাইটি”— যাদেরকে বলা হয় আধুনিক অলিম্পিকের স্বপ্নদ্রষ্টা ৷

মূলত গ্রীকরা চেয়েছিল, তারাই যেন এই গেমসের একমাত্র আয়োজক থাকে ৷ গ্রীকদের এই ঐতিহ্যপ্রবণ মতবাদে তৎকালীন অনেক ক্রীড়াবিদই একমত থাকলেও বিশ্ব অলিম্পিক সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা বিভিন্ন দেশে পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে ৷ আধুনিক অলিম্পিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসরের আয়োজক ছিল ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র ৷ সেখান থেকেই গ্রীষ্ম ও শীত আসরে বিভক্ত হয়ে আজকের অলিম্পিক গেমস বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে এবং পুরুষদের পাশাপাশি নারী,প্রতিবন্ধী ও তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহন এই দক্ষযজ্ঞকে দিয়েছে ক্রীড়া জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসরের তকমা ৷

পৃথিবীর সবদেশের পতাকায় থাকা সবচেয়ে সাধারণ রংগুলির সমন্বয়ে তৈরি পাঁচটি নির্দিষ্ট রঙের বলয় দেখা যায় অলিম্পিকের পতাকায়,যাদের পরস্পরের জড়িয়ে থাকা আন্তঃমহাদেশীয় সম্প্রীতির স্মারক হিসেবে পৃথিবীখ্যাত ৷ অলিম্পিকের মটো ল্যাটিন ভাষায় “সিটিয়াস, অলটিয়াস, ফোর্টিয়াস” যার বাংলা হল “দ্রুততর, উচ্চতর, বলবত্তর”।

আরোও পড়ুনঃ জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির সাক্ষাতকার

অলিম্পিকে বর্তমানে সারা পৃথিবী থেকে ২৮ টি খেলার জন্য ৩০১ টি বিভাগে সাড়ে দশ হাজার প্রতিযোগী অংশ নিতে পারেন ৷ দলগত অথবা একক প্রতিযোগীতায় প্রথম,দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অধিকারীদের জন্য সোনা,রূপা ও ব্রোঞ্জ ব্যবস্থা আছে অলিম্পিকে ৷ 

এই বছরই জাপানে “অলিম্পিক ২০২০” আসরের পর্দা উঠছে ৷ জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং চোখ ধাঁধানো ব্র্যান্ডিংয়ের বাহারী চমকের সাথে অলিম্পিকের মূল মনস্তত্বের অনেক বিতর্ক থাকলেও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখানো এই ক্রীড়াযজ্ঞ এখনো লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে নির্মল বিনোদনের আদর্শ মাধ্যম ৷ বিবর্তনের একাল-সেকালে অলিম্পিক গেমসে হয়তো বহুবার পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু অফুরান বিনোদনের সজীব উৎস হিসেবে যুগে যুগে অলিম্পিক গেমস একটুও বদলায়নি ৷ প্রতিবার ভিন্ন আমেজ নিয়ে শুরু হওয়া এই দক্ষযজ্ঞ, পৃথিবীকে এক করে রাখে নিজের মত ৷ পুরো পৃথিবীকে এক করে রাখবার চিরন্তন সুন্দর গল্পে অলিম্পিক গেমস চিরকালই এক উন্নত দৃষ্টান্তের ছবি হয়ে আছে,এবং থাকবেও ৷