কারিগর
কারিগর

আধুনিক ডিজেল ইঞ্জিনের কারিগর

আপনার অফিস বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, ছেলেমেয়ের স্কুলও হাতের নাগালে নেই। তার ওপরে আপনি ভ্রমণবিলাসী। বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতে আপনার সব দিক থেকেই ভীষণ সমস্যা। এমন অবস্থায় আপনাকে যদি একটা রিক্সা দেয়া হয় অথবা গরুর গাড়ি, তাহলে সেগুলো কি আপনার সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট হবে বলে মনে হয়? নিশ্চয়ই না।

তবে এসব কিছুই এখন আর সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না। আমাদের আছে চার চাকার গাড়ি এবং ডিজেল ইঞ্জিন যা আকৃতিতে ছোট, খরচে কম আর যার কাজের জন্য প্রয়োজন সীমিত জ্বালানীর।

আর শুধু গাড়ির জন্যই নয়, আজকাল যেসব জায়গায় চাকা ঘোরাবার প্রয়োজন আছে, যেমন – ক্লিনিকে, কারখানায়, খেলনার দোকানে, স্বর্ণকারের দোকানে ইত্যাদি সমস্ত জায়গায় ডিজেল ইঞ্জিন এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এত উপকারী ব্যবস্থাপনা যিনি উদ্ভাবন করেছিলেন সেই মানুষটি হলেন বিজ্ঞানী রুডলফ ডিজেল। বিপ্লবী এই আবিষ্কারের পর তিনি ঠাট্টার সুরে বলেছিলেন, “আগের ইঞ্জিন ছিল খড়ের ঘরের মত বিশাল আর আমার ইঞ্জিন টুপির মতই ছোট”। আজ আমরা এই অদম্য মেধাবী মানুষটির জীবন নিয়ে জানবো।

রুডলফ ডিজেল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৮৫৮ সালের ১৮ ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা থিওডোর ডিজেল ছিলেন একজন কামার, সেইসাথে একজন উদ্যাক্তাও বটে। বিশাল এক জুতোর কারখানার মালিক ছিলেন তিনি। রুডলফের মা ছিলেন একজন জার্মান বংশোদ্ভূত নারী। রুডলফের শিক্ষার হাতেখরি হয় ফ্রান্সের প্রাইমারি স্কুল গ্রামারে। তিনি ছোটবেলায় ছিলেন বেশ হৃষ্টপুষ্ট এবং সুন্দর।  অন্যদিকে তাঁর মা জার্মানির বংশোদ্ভূত হওয়ায় রুডলফকে তার বন্ধুরা জার্মান শূকরছানা বলে ঠাট্টা করত। এসব উপেক্ষা করে মেধার জোড়ে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে পড়াশোনাটা বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে নিলেন তিনি।

এরপর হুট করেই একদিন রুডলফের বাবার জুতো বানানোর কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। ফলে নিজের খরচ নিজেকেই যোগাতে হল তাকে। তিনি নানা রকম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে অংশ নিতেন। পিয়ানো বাজানো কিংবা নাটকে অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর পারদর্শীতা দেখালেন। অধ্যয়ন শেষে তিনি তার গুরুকে খুজে পেলেন। বিখ্যাত শিল্পপতি এবং মেকানিক্যাল রেফ্রিজারেশনের অধ্যাপক কার্ল ভন লিন্ডেকে অনুসরণ করলেন তিনি। কার্ল ভনের সান্নিধ্যে থেকে প্রায় দু বছর ধরে রুডলফ প্রকৌশল বিদ্যা আত্মস্থ করলেন। এরপর তিনি সুইজারল্যান্ডের সুলজার মেশিন ওয়ার্কস কোম্পানিতে যন্ত্রাংশের দক্ষ ডিজাইনার হিসেবে চাকরি নিলেন। তখনকার সুইজারল্যান্ড স্টিম ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেখানে রুডলফ দুই বছর থাকলেন। এতদিনে ঘন্টা বাজল ফ্রান্সের যুদ্ধ সমাপ্তির। সময় হল নিজের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের। রুডলফ ফিরে এলেন ফ্রান্সে। তবে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতেও তিনি গুরু কার্ল ভনের পরামর্শ নিয়েছিলেন। শুরু হল জীবনের নতুন অধ্যায়।

কার্ল ভনের বানানো রেফ্রিজারেটর এবং যন্ত্রাংশ তিনি ফ্রান্সে আমদানি করতে থাকলেন। ধীরে ধীরে তার আর্থিক অবস্থা বদলে গেল। নিজের ব্যবসাকে আরও বেশি বর্ধিত করায় মনোনিবেশ করলেন রুডলফ। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে ওঠায় রুডলফ বাবাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেন পুনরায় জুতো বানানোর কারখানা চালু করার জন্য। থিওডোর ডিজেল ছেলের সাহায্যে আবার ব্যবসা শুরু করলেন।

এরপর ২৫ বছর বয়সী মার্থা ফ্র্যাচ নামের জার্মান বংশের এক মেয়েকে বিয়ে করলেন রুডলফ। তারা এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক-জননী হলেন।

মেধাবী বাবার মেধাবী পুত্র পরবর্তীতে হয়েছিলেন বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী এবং ধর্মগুরু। আর মেধাবী কন্যা হয়েছিলেন দর্শনের অধ্যাপক। এইতো গেল সংসারের কথা, এবার আবিষ্কারের কথায় আসি।

রুডলফ এবার প্যারিসেই একটি কারখানা স্থাপন করলেন। স্টিম ইঞ্জিনের ওপর লক্ষ্য স্থির করে নিজের সমস্ত অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে একটি নতুন ইঞ্জিন বানালেন তিনি। তবে এটি তাঁর মৌলিক আবিষ্কার হল না। কেননা এটিও ছিল একটি স্টিম ইঞ্জিন। তিনি ইঞ্জিনটির নাম দিলেন ব্ল্যাক মিস্ট্রেস। একদিন ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে অ্যামোনিয়া গ্যাসকে পরীক্ষা করার সময় দুর্ঘটনা ঘটালেন তিনি। তবে এতে তাঁর উপকারই হোলো। অ্যামোনিয়া গ্যাসকে কাচের শিশিতে ভর্তি করে তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে বোমা জাতীয় অস্ত্র আবিষ্কার করলেন যা লোথাল বোমা নামে পরিচিত এবং একে বুলেটের মত ব্যবহার করা সম্ভব। ফ্রান্সের যুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানালেও তারা তাকে অস্ত্র বানানোর কোন অনুমোদন দিলেন না। তখন তিনি জার্মানির কাছে প্রস্তাব দিলেন। জার্মানি অবশ্য পরোক্ষভাবে তাকে অনুমোদন দিল। এই শর্ত ধার্য করা হল যে তিনি একটি জার্মান কোম্পানিতে নির্দেশনা দিবেন এবং বিনিময়ে তিনি অর্থ পাবেন। সবকিছু মেনে নিয়েই রুডলফ জার্মানির লিন্ডে এন্টারপ্রাইসে প্রবেশ করলেন। তবে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না তাকে। অস্ত্রের রাতারাতি উন্নতির ফলে সরাসরি জার্মানি থেকে অনুমোদন পেলেন তিনি।

এই ঘটনার পরপরই তিনটি স্বনামধন্য কোম্পানি এগিয়ে এল রুডলফকে আর্থিক সহায়তা দেবার জন্য। এদের মধ্যে অ্যাগসবার্গের মেশিন ফেব্রিক কোম্পানিতেই রুডলফ ডিজেল ইঞ্জিনের একটি মডেল নির্মাণ করলেন। তবে অন্যসব আবিষ্কারের মতই প্রথম মডেলটি দেখতে খুবই অত্যাধুনিক হল না। প্রাথমিক অবস্থায় একটি ফ্লাইহুইল সংযুক্ত ছিল প্রায় দশফুট লম্বা লোহার রডের সাথে। ফ্লাইহুইলটি নিজেই শক্তি উৎপাদন করে  ঘুরতে পারত। পরবর্তীতে তিনি মডেলটিকে আরও ঘষামাজা করতে থাকলেন। এভাবে আরও দু বছর নিরলস পরিশ্রম শেষে রুডলফ ১৮৯৮ সালে নিজের নামে ডিজেল ইঞ্জিন বাজারে ছাড়লেন। এত দিনের নিরলস প্রচেস্টা অবশেষে গন্তব্য পেল। রুডলফ ডিজেল আর সাধারন কেউ রইলেন না। রাতারাতি মিলিওনারি হয়ে উঠলেন তিনি। অর্থের চেয়েও বড় বিষয় এই যে, সারা বিশ্বে তিনি সর্বকালের একজন সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।

আবিষ্কারের পাশাপাশি তিনি সমাজবিজ্ঞান নিয়ে অনেক লিখেছিলেন। তবে তাঁর লেখার একটিমাত্র সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘সলিডারিসেমাস’ বইটিতে, যদিও বইটি বিক্রির মাপকাঠিতে সফলতা পায় নি।কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায় না কেননা রুডলফের আবিষ্কার নিয়েই রচিত হয়েছে অনেক বই। রুডলফের আবিষ্কৃত ইঞ্জিন ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ প্লান্টে, জলসেচ প্রকল্পে, জলযানে, গাড়িতে সর্বত্রই ব্যবহৃত হতে লাগল। 

Check Also

ধর্ষণ, নিপীড়ন – কোন দেশে কত জন?

ধর্ষণ পৃথিবীর গর্হিত অপরাধগুলোর একটি। একেক দেশে এটির শাস্তি বিধান একেক রকম। অনেক দেশেই ধর্ষণকে …