আসক্তির নতুন নাম ইন্টারনেট

ইন্টারনেট
আসক্তির নতুন নাম ইন্টারনেট
ইন্টারনেট

আপনি কি আপনার সারাদিনের অধিকাংশ সময় অনলাইনে ব্যয় করেন? অনলাইনই কি আপনার নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম? মোবাইল হাতে পেলেই কি একটিবারের জন্য ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা ইনস্টাগ্রাম চেক করে নিচ্ছেন? আপনার অনলাইন ব্যবহার কি আপনার ব্যক্তিগত জীবনের উপর প্রভাব ফেলছে? যদি উপরের যেকোন একটি প্রশ্নের উত্তরও ‘হ্যাঁ’ হয়ে থাকে, তবে আপনি সম্ভবত ইন্টারনেট আসক্তিতে আক্রান্ত পৃথিবীর আর সব মানুষদের একজন, যা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল মানসিক সমস্যাগুলোর একটি ৷ সাধারণ অর্থে বলা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে যখন কোন মানুষের স্বাভাবিক কর্মকান্ড ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং এটি যখন তার ব্যক্তিগত জীবনেও ব্যাপক হারে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন তাকে ইন্টারনেট আসক্তি বলে ৷ প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্যতা যত নিশ্চিত হয়েছে আমরা বুঝতেই পারছিনা কোনটি প্রয়োজন আর কোনটি আসক্তি ৷ তাই আজকে আমরা ইন্টারনেট আসক্তি, এর কারন, লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করব ৷

পৃথিবী জুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়েছিল মানুষের কল্যানের কথা চিন্তা করেই৷ কিন্তু ১৯৯৭ সালের একটি ঘটনা পুরো পৃথিবীকে ইন্টারনেটের ব্যবহার সমন্ধে নতুন করে ভাবতে শেখায়৷

সান্দ্রা হ্যাকার নামের একজন মহিলা ১৯৯৭ সালে তার তিনটি শিশু সন্তানকে ঘরে আটকে রেখে ১২ ঘন্টারও বেশি সময় ইন্টারনেটে ব্যয় করেন। এই ঘটনার পর মনোবিদরা একটি বিষয় সমন্ধে নতুন অনুসিদ্ধান্ত গ্রহন করেন ৷ Cincinnati Case খ্যাত সেই ঘটনাটির পর থেকে মনোবিদরা বলেন, “ড্রাগের মতন ইন্টারনেটেরও এমন একধরনের সম্মোহনী ক্ষমতা আছে, যা নির্দিষ্ট সময় ব্যবহারের পর মানুষ নিজের অজান্তে, এমনকি মনের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে বাধ্য হয়৷” একেই পরবর্তীতে ইন্টারনেট এডিকশন ডিজঅর্ডার বা IAD নামে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন৷

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইন্টারনেট আসক্তিকে এখনো কোন রোগ হিসেবে দেখতে নারাজ তবুও বিশ্বজোড়া মনোবিদগণ এর উপর বিশেষভাবে জোড় দিয়েছেন৷ তারা চিহ্নিত করেছেন, যেকোন রাষ্ট্রের তরুণরা বয়স্কদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এবং একজন ইন্টারনেট আসক্ত তরুণের রোজ ইন্টারনেট ব্যবহারের হার গড়ে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘন্টার মত৷ একটা সময় ছিল যখন ইন্টারনেট ব্যবহার শুধুই কাজের অংশ ছিল৷ সবকিছু ছাপিয়ে এটি কেন নেশা হয়ে উঠল, এর নেপথ্যে কি কি কারন লুকিয়ে আছে চলুন একটু চোখ বুলিয়ে আসা যাক৷

মানসিক অবস্থা:

পৃথিবী যত এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভেতর সরাসরি সমস্যা সমাধানের চিন্তা ততই লোপ পাচ্ছে ৷ আমরা কোন কিছুকেই তলিয়ে দেখতে চাইনা ৷ ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য হওয়ার কারনে আমরা এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে, আমরা বুঝতেও পারছিনা এটি আমাদের স্বাভাবিক পরিশ্রম,মানসিক সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে ৷

কৌতুহল ও অতি উৎসাহ:

অল্প বয়সী যে কেউ, যে কোন বিষয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উৎসাহী থাকেন ৷ অল্প বয়সী এবং নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেট ঘুরে নিত্য নতুন বিনোদনের নেশায় ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েন৷

বিকল্প বিনোদন:

বিনোদন মাধ্যমগুলোর যে সমস্ত উপযোগীতা রয়েছে, ইন্টারনেট তার সবটুকুই মেটাতে সক্ষম ৷ বাস্তব বন্ধুবান্ধবের তুলনায় ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধবের প্রতি আগ্রহ, একমাত্র বিনোদন মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটকে বেছে নেয়া ও এর ঘন ঘন ব্যবহার মানুষকে ইন্টারনেটে আসক্ত করছে ৷

সাইবার সেক্সুয়াল আকর্ষন:

Girl addicted to internet during night, horizontal

যৌন স্বাধীনতার অবাধ সুযোগ থাকার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম হলো ইন্টারনেট ৷ সেই সুযোগের অপব্যবহার অনেক সময় মানুষকে ইন্টারনেট এর প্রতি তীব্র আকর্ষিত করে তুলতে পারে যা একসময় আসক্তি পর্যায়ে চলে যায় ৷

স্ট্যাটাস আপডেট এংজাইটি সিনড্রম: ইন্টারনেটের সাথে ব্যক্তিজীবন জড়িয়ে গেলে মানুষ এমনভাবে চিন্তা করে, যেন ইন্টারনেটই নিজেকে প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম ৷ তখন তার মনোসংযোগও এমনভাবেই পরিচালিত হয়, যেন নিজেকে ইন্টারনেটেই একমাত্র পুরোপুরি প্রচার করতে হবে ৷ সেটা একসময় পুরোপুরি ব্যক্তিগত নির্ভরতার জায়গা হয়ে যায় ৷ কোনক্রমে সেই প্রচার ব্যাহত হলে মানুষটি এক ধরনের উদ্বিগ্নতার ভেতর দিনাতিপাত করে ৷ তাকেই বলা হয়েছে স্ট্যাটাস আপডেট এংজাইটি সিনড্রম যেটি ইন্টারনেট আসক্তির বড় কারন ৷

কোন মানুষ ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে গেলে তার ভেতর নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা যায়:

১) একজন ইন্টারনেট আসক্ত মানুষ তার প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সময় ইন্টারনেটে অতিবাহিত করেন ৷

২) একজন ইন্টারনেট আসক্ত মানুষ সারাদিনই ইন্টারনেটে তার পূর্ব কার্যক্রম ও ভবিষ্যত কার্যক্রম নিয়ে চিন্তা করে থাকেন ৷

৩) একজন ইন্টারনেট আসক্ত মানুষ পুরোপুরি অনলাইনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং নিকটাত্মীয় ও ঘরের মানুষের কাছ থেকে এই তথ্যটি এড়িয়ে চলতে চান ৷

৪) তীব্র ইন্টারনেট আসক্তির কারনে তার মধ্যে নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, যেমন: মাথা ব্যথা, চোখে সমস্যা,ওজনের তারতম্য,পিঠ ব্যথার মত অসুখে ভুগতে শুরু করেন ৷

৫) যখনই একজন ইন্টারনেট আসক্ত মানুষ এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রনে আনতে চাইবেন সাথে সাথে তার মধ্যে হতাশা,উদ্বিগ্নতা, রগচটা মেজাজ—বিষয়গুলো ঘন ঘন কাজ করতে শুরু করবে ৷

উপরের যেকোন একটিই যদি কারো মধ্যে থাকে, ধরে নেয়া যায় ইন্টারনেট আসক্তি তার মধ্যে রয়েছে ৷ যেহেতু উন্নত বিশ্বে ঘন ঘন এই সমস্যাটি দেখা যাচ্ছে তাই এর প্রতিকার হিসেবে মনোবিদরা বিভিন্ন পরামর্শ দিতে চেষ্টা করছেন ৷ চলুন উক্ত সমস্যার কিছু প্রতিকারের কথা জেনে আসি ৷

প্রথমেই ইন্টারনেটে যেসব জায়গায় সময় অতিবাহিত করা হয় সেসব জায়গা চিহ্নিত করে দরকারি,কম দরকারি এবং অদরকারি — তিনটি ভাগে ভাগ করতে হয় ৷ প্রথমে অদরকারিগুলোকে বাদ দিতে হবে, তার কম দরকারিগুলোকে বাদ দিয়ে দরকারিগুলোতে সময় কমিয়ে আনতে হবে ৷ দায়িত্ববোধ অনুধাবন করার বিষয়টি নিজের সাথে নিজের নিশ্চিত করতে হবে ৷ পারিবারিক দায়বদ্ধতা, সুসম্পর্কের প্রতি জোর দিলে অনেকাংশেই ইন্টারনেট আসক্তি কমে আসে বলে মনে করা হয় ৷ ইন্টারনেট আসক্ত তরুনদেরকে মনোবিদরা বলেছেন বাস্তবতা ভিত্তিক চিন্তা করবার কথা ৷ তাদেরকে ঘরমুখী আচরন পরিত্যাগ করে বাইরের পৃথিবীটাকে দেখবার ও অনুভব করবার কথা বলছেন তারা ৷ এবং মানসিক দৃঢ়তাকে অন্যান্য আসক্তির মত এই আসক্তিতেও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় ৷

ইন্টারনেট ব্যবহারের আদর্শ সময়সীমা সমন্ধে কোথাও কিছু বলা নেই ৷ কিন্তু বয়সসীমা অনুযায়ী সময়সীমা রেখা নির্ধারন প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য হলেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সঠিক যত্ন ও উদার সহায়তাপ্রবণ পরিবেশই পারে আসক্তি কাটিয়ে নতুন জীবনের মুখ দেখাতে ৷ ইন্টারনেট ভালো কিছুর সহায়ক হোক, বিকল্প না হোক প্রকৃত অনুভূতির ৷ 

Check Also

কিলার ড্রোন

চীনেই প্রথম কিলার ড্রোন !

কেমন হয় যদি বলি আপনার হাতে একটি রিমোট দেবো এবং আপনি শুয়ে বসে জলভাগ দাপিয়ে …