একজন বিদ্রোহী বিজ্ঞানী
একজন বিদ্রোহী বিজ্ঞানী

একজন বিদ্রোহী বিজ্ঞানী

বিজ্ঞানের প্রধান প্রধান শাখাগুলোর মধ্যে ‘জ্যোতির্বিদ্যা’ অন্যতম৷ এটির আধুনিকায়নে যে মানুষটির নামটি প্রথম সারিতে পরে তিনি হলেন গ্যালিলিও গ্যালিলাই৷ তবে গ্যালিলিওর জীবনের গলিটা ভীষণ গোলমেলেই ছিল৷ আজকের গল্পটি মূলত প্রচণ্ড মেধাবী এই মানুষটির জীবন নিয়ে।

গ্যালিলিও গ্যালিলাই ইতালির পিসা শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷ তার বাবা পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু গ্যালিলিওর মা ছিলেন ভীষণ রগচটা। অল্পেতেই একেবারে হুলস্থুল করে ফেলতেন তিনি৷ ছোটবেলা থেকেই গ্যালিলিও বিভিন্ন বিচিত্র বিষয়ের প্রতি উৎসাহী ছিলেন৷ তবে Vallombrosa’তে পড়ার সময় ধর্মীয় শিক্ষকদের প্রভাবে গ্যালিলিও ভেবেছিলেন যে তিনি যাজকের জীবনকেই বেছে নেবেন। যেই ভাবনা সেই কাজ। সারাক্ষণ পুথি-পত্র ঘাটাঘাটি করতেন তিনি। আর এসবের মাঝেও একটি বিশেষ মোহ তাকে চুম্বকের মত টানতো। সেই মোহের নাম অংক৷ তিনি অংকের প্রতি এমন আসক্তি পেলেন যে বাড়িঘর, ব্যবসা কিছুই তার খেয়ালে থাকতো না৷ গ্যালিলিওর বাবা ভাবলেন ছেলে যেহেতু অংকে এত উৎসাহী, তাহলে তাকে ডাক্তারি পড়াবেন যাতে করে গ্যালিলিও অনেক অর্থ রোজগার করতে পারে। এরপর তাকে পিসার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হল।

সেখানে ভর্তি হওয়ার পর একটা মজার ব্যাপার হল৷ আর ১০জন যেমন শিক্ষকের সমস্ত কথা একেবারে যথা অনুসরণীয় বলে মেনে নিচ্ছে সেখানে গ্যালিলিও সব কিছুকে স্বীকার করে নিতে পারল না। বরং বিভিন্ন বিষয়ে তাদেরকে প্রশ্ন করে বিব্রত করে তুলতেন তিনি৷ নতুন কিছু জানার বাধভাঙা উচ্ছাসে নিজের ছোট্ট ঘরটিতেই বানালেন একটি পরীক্ষাগার।

তখনকার সময়ে ইতালির রাজ পরিবারে অংকের শিক্ষক ছিলেন রিচি৷ এদিক দিয়ে, তিনি ছিলেন গ্যালিলিওর বাবার বন্ধু। একদিন গ্যালিলিও রিচির বাসায় গেলেন এবং ওই সময়টিতে রিচি তার ছাত্রদেরকে ইউক্লিডের জ্যামিতি পড়াচ্ছিলেন। দরজার ওপাশে দাড়িয়ে গ্যালিলিও নিবিড়ভাবে রিচির আলোচনা শুনলেন৷ তিনি যেনো আবারও শক্তি ফিরে পেলেন, আবারও তার বুকের মাঝখানে অংকের সমাধি থেকে বেড়িয়ে এলো একটি চারাগাছ।

পুরোদমে শুরু হলো ইউক্লিড-আর্কিমিডিসীয় পড়াশোনা। তবে তা গোপনে, এতটা গোপনে যে, গ্যালিলিও এসব বই পড়ার জন্য ডাক্তারি বইগুলোর ভেতর এগুলোকে লুকিয়ে রেখে পড়তেন । আর এই গবেষণায় সাহায্য করলেন রিচি৷

এমন সময় একটা যুগান্তকারী ঘটনা ঘটলো গ্যালিলিওর জীবনে৷ সেদিন পিসার ক্যাথিড্রালে বসে তিনি প্রার্থনা করছিলেন। সেই কক্ষের ঠিক মাঝখানে ছিল বড় আকারের একটি ঝাড় লন্ঠন৷ প্রদীপ জ্বালবার সময় একজন ক্লার্কের হাত লেগে সেটি দুলতে শুরু করে। এতে করে দোলনের পাশাপাশি ঘর্ষণের শব্দ আসতে থাকে। গ্যালিলিও নিবিড়ভাবে দেখলেন যে, প্রতিটি ঘর্ষণের শব্দ এক থাকলেও প্রতিটি দোলনের গতি কমে আসছে৷ এই বিষয়টি থেকেই তিনি পেন্ডুলাম আবিষ্কার করেছিলেন। গ্যালিলিওর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে এই নক্সা দেখেই তৈরী করেছিলেন পেন্ডুলাম ঘড়ি।

ডাক্তারি আর পড়া হলো না৷। ডাক্তারি ছাত্র হয়ে গেলো পদার্থবিদ্যা আর গণিতের ছাত্র। তখন পঁচিশ বছরের গ্যালিলিও শিলিঙে নাম মাত্র মাইনে নিয়ে অংকের শিক্ষক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে এক অন্য দুনিয়া দেখলেন তিনি, যে দুনিয়ায় অ্যারিস্টটলই রাজা আর অ্যারিস্টটলেই আটকে আছে পুরো পৃথিবী৷ অ্যারিস্টটল মানেই সত্য, কেউ নেই সে সত্য যাচাইয়ের। সবাই যেন কাঠের চশমা পরে বসে আছে৷ তবে গ্যালিলিও ছিলেন স্বচ্ছ চোখের অধিকারী৷ তাই কিছু বিষয়ে অ্যারিস্টটলের সাথে তার বনিবনা হল না৷ এজন্য তাকে অনেকেই ভণ্ড ও প্রতারক বলে গালি দিতে থাকল।

তিনি বললেন, অ্যারিস্টটলের মতবাদে ভুল বলা আছে। ‘দুটি বস্তু একই উচ্চতা থেকে একই সময়ে ফেলে দেয়া হলে ভারী বস্তুটি হালকা বস্তুর আগে মাটি স্পর্শ করবে’ এ তত্ত্বটির যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে৷ সকলেই এ বক্তব্যে গ্যালিলিওকে পাগল বলে আখ্যায়িত করল৷ গ্যালিলিও ছিলেন বেপরোয়া। তিনি শহরের সকল জ্ঞানীগুণীকে আহবান জানালেন পিসার হেলানো টাওয়ারের সামনে। সেখানে উপস্থিত কয়েকজনকে নিয়ে উঠে গেলেন টাওয়ারের চূড়ায়৷ দু’হাতে আলাদা আলাদাভাবে ১০পাউন্ড এবং এক পাউন্ডের ২টি বল তিনি একই সময়ে ফেলে দিলেন। সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলো, কেননা বল দুটি একই সময়ে মাটি স্পর্শ করল। তিনি তার কথার সত্যতা প্রমাণ করলেন। কিন্তু কথায় আছে যারে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা৷ কিছু মানুষ এটাকে কারসাজি হিসেবে দাবি করল। 

সে সময় বন্দরের বিভিন্ন স্থানে পলি নিষ্কাশনের জন্য একটি যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়৷ এর আবিষ্কারক ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার ডন জিওভানি, যিনি পিসার ডিউকের পুত্র (এক কথায় রাজকুমার)। যন্ত্রটি নিরীক্ষণের জন্য গ্যালিলিওর কাছে পাঠানো হল। গ্যালিলিও সেটিকে কাজের অযোগ্য বলে জানিয়ে দিলেন। প্রচণ্ড ক্ষোভে জিওভানি গ্যালিলিওকে সেখান থেকে বিতাড়িত করলেন। তিরস্কারে তিরস্কারে গ্যালিলিওর জীবন হয়ে উঠল দুর্বিষহ। এতটা অপমান যে কোন মানুষের পক্ষেই মেনে নেয়া  অসম্ভব৷

গ্যালিলিওর আশা স্বপ্ন কোনটাই তো ফুড়িয়ে যেতে পারে না, তিনি যে বিদ্রোহী বিজ্ঞানী। ভাগ্য সবসময়ই সাহসীদের পক্ষে, এবারো তেমনটাই হল গ্যালিলিওর সাথে। এমন দুর্দিনেও কিছু সত্যিকারের বন্ধুর সহায়তায় তিনি গনিতের অধ্যাপনা শুরু করলেন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার মাইনেও  অনেক বেশি ধার্য হল। সেই সাথে রিসার্চ করার জন্য গ্যালিলিও পেলেন একটা উত্তম পরিবেশ৷ সেখানে থাকতেই কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করলেন তিনি। বইগুলো প্রকাশের পরপরই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপের আনাচে-কানাচে৷ মাইনে আরও বাড়ল তার। এমন হল যে, শুধুমাত্র ছাত্রদের সাক্ষাৎ দেবার জন্য তিনি বিরাট এক বাড়ি ভাড়া নিলেন। গ্যালিলিও এরপর মারিনা গাম্বা নামের এক সমাজ থেকে বহিস্কৃত মহিলার সাথে গড়ে তোলেন সুখী জীবন। এই মারিনার গর্ভেই জন্মেছিল তার তিনটি সন্তান।

একে একে আবিষ্কৃত হল দিক নির্ণয়ের কম্পাস, তাপ পরিমাপের থার্মোমিটার আর পানি উত্তোলনর লিভার । ফলে গ্যালিলিওর মাইনে বাড়লো আরও, কিন্তু উৎসাহ কমল না এতটুকুও। এবারে জ্যেতির্বিদ্যায় মন দিলেন তিনি। তখন আকাশে একটি নতুন মুখ। কেউ বলছে তারা, কেউ বলছে উল্কা আবার কেউ বা বলছে গ্রহ। কিছুদিন পর্যবেক্ষণের পর তিনি বলে দিলেন এটি একটি নিছক তারা বাদে আর কিছুই নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান, বিশ্ব প্রকৃতি, শব্দ ,আলো ,গতি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখলেন তিনি। সাড়াও পেলেন যথেষ্ট। এর মাঝেই ভাসা ভাসা শোনা গেলো কোন এক চশমার দোকানদার নাকি এমন কিছু পেয়েছেন যা দিয়ে অনেক দূরের জিনিসও দেখা যায়। গ্যালিলিও কথাটিকে গুরুত্ব দিয়ে নিলেন। অনেক পরীক্ষার পর একটি শূন্য নলের মধ্যে উত্তল ও অবতল লেন্সকে নির্দিষ্ট দূরত্বে বসাতেই দেখলেন অনেক দূরের একটি বাড়ি হাতের নাগালে মনে হচ্ছে। ব্যাস! হয়ে গেল যুগান্তকারী যন্ত্র টেলিস্কোপের আবিষ্কার।

লোকেরা এসে ভীড় করতে লাগলেন ভেনিসের উঁচু বাড়িটায়। তাদের বিস্ময় ভরা চোখ দেখলো দূরের সমুদ্র, পাহাড় আর আকাশ ভর্তি রাতের তারা। এই টেলিস্কোপ বড় পরিসরে নির্মাণ করে অনেক অনেক পর্যবেক্ষণ শেষে রচনা করলেন সাইডারাস নানশিয়াস বা দ্যা মেসেঞ্জার বইটি, যেটিতে আলোচনা করা হয়েছে চাঁদ, শনির বলয় এবং জুপিটার গ্রহ সম্পর্কে বিস্তারিত।

এতদিনে ভক্তের পাশাপাশি শ্ত্রুর সংখ্যাও অনেক হয়েছে তার। সূর্যকে নিয়ে একটি চিরন্তন সত্য মতবাদ জানালেন তিনি। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে নয় বরং পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে বললেন তিনি। এতে করে বহুকাল ধরে বাইবেলে প্রতিষ্ঠিত একটি উক্তির ভিত নড়ে যায়। তাই এটিকে কারন হিসেবে ব্যবহার করে শত্রুরা চড়াও হল গ্যালিলিওর ওপর। এমনকি বিচারকদের সামনেও উপস্থিত হতে হল তাকে। বলা হল – সূর্য আর পৃথিবী সম্পর্কে আর কিছু লিখতে পারবেন না তিনি কেননা তা ধর্মের বিরুদ্ধে যায়। আর নিষেধ অমান্য করলে পেতে হবে ভয়াবহ শাস্তি। উপায় না দেখে অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করে ছাড়া পেলেন তিনি।

কিন্তু গ্যালিলিও ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। আবারো যাত্রা শুরু করলেন তিনি, তবে খুব গোপনে। কেউ কিচ্ছুটি জানল না। দীর্ঘ ১৫ বছর পর রচিত হল বিখ্যাত একটি গ্রন্থ যার তিনটি চরিত্রের প্রথমজন ছিলেন কোপারনিকাসের সমর্থক দ্বিতীয়জন টলেমীর এবং তৃতীয়জন নিরপেক্ষ।

আবারও অভিযোগ এলো গ্যালিলিও নাকি ব্যঙ্গাত্মক ভাবে ধর্মকে আঘাত করেছেন। দ্বিতীয়বার বিচার সভায় আনা হল তাকে। বইটির কিছু অংশ পরিবর্তন করবেন এই শর্তে মুক্ত হলেন তিনি। অথচ পরিবর্তনের পরেও ক্ষান্ত হলেন না সমালোচকরা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হল তাকে। গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় নিজ গ্রামে যাবার অনুমতি পেলেন তিনি। তবে গ্যালিলিও বরাবরই রগচটা ও বিদ্রোহী। আবারো গোপনে কাজ শুরু হল। এবার আর বইটি ইতালিতে প্রকাশ হবার আশা রইল না। হল্যান্ডে পাঠিয়ে দিলেন পান্ডুলিপিটি। অবশেষে ১৬৩৮ সালে প্রকাশিত হল তার এই যুগান্তকারী সৃষ্টি।

দুঃখের বিষয়, নিজের সৃষ্টিকে তিনি দুচোখ ভরে দেখতে পেলেন না। এতদিনে দৃষ্টিশক্তি একেবারেই চলে গেছে তাঁর। অন্তিম পাঁচ বছর অন্ধ হয়েই কাটালেন এই মহান বিজ্ঞানী। শেষ সঙ্গ হিসেবে কাছে ছিলেন গ্যালিলিওর একান্ত অনুগত ছাত্র জিভানি। শেষ কটা দিন প্রিয় শিক্ষককে অকাতরে সেবা করেছেন তিনি।

১৬৪২ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তার হাত দুটি আঁকড়ে ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি বিপ্লবী গ্রন্থ যার নাম, “ দ্য ল অফ মোশন ”।

Check Also

ধর্ষণ, নিপীড়ন – কোন দেশে কত জন?

ধর্ষণ পৃথিবীর গর্হিত অপরাধগুলোর একটি। একেক দেশে এটির শাস্তি বিধান একেক রকম। অনেক দেশেই ধর্ষণকে …