গুগল এলো যেভাবে

আর কেউ জানুক বা না জানুক, গুগল মানেই ‘সবজান্তা’র আরেক নাম। গুগল সব জানে! কিন্তু এইতো কিছুদিন আগেও তো গুগল ছিলো না। তখন, সেই অ্যানালগ পৃথিবী থেকে ডিজিটাল দুনিয়ার পথে মানুষকে কয়েক ধাপ এগিয়ে আনা গুগল কীভাবে কাজ শুরু করলো? কার মাথায় প্রথম এসেছিলো গুগলের চিন্তা? একটু একটু করে গুগলে এতো তথ্য কীভাবে জড় হলো? চলুন আজ সবজান্তা গুগলের আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক।

একজন ল্যারি পেজের গল্প

গুগলের গল্পটা শুরু হয়েছিলো এর নির্মাতা ল্যারি পেজের মাধ্যমে। ১৯৭৩ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বাবা কার্ল ভিক্টর পেজ এবং মা গ্লোরিয়া পেজের কোল জুড়ে আসে দ্বিতীয় সন্তান। বাবা-মা ছেলের নাম রাখেন লরেন্স এডওয়ার্ড পেজ। বাবা এবং মা দুজনেই ছিলেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এ বিশেষ দক্ষ। তাই তাদের সহচর্যে ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন ল্যারি। 

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে নিজের পড়াশোনাও ল্যারি শেষ করেন কম্পিউটার সায়েন্সে। এইসময় ‘সোলার কার টিম’ নামক একটি দলে যোগদান করেন ল্যারি। পরবর্তীতে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করার জন্য স্টানফোর্ডে চলে যান তিনি। সেখান থেকেই গুগলের চিন্তা শুরু হয় তার। 

গুগলের শুরু

স্ট্যানফোর্ডে শুধু ল্যারি নয়, পড়তে গিয়েছিলেন সার্গেই ব্রিনও। সেখানেই এই দুজনের মধ্যে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একটি গবেষণা প্রকল্পে যৌথভাবে কাজ শুরু করেন ল্যারি এবং সার্গেই। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের লিংক নিয়ে তারা ঠিক করতেন যে কোনটি তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো। তাদের একের পর এক সাজাতেন তারা। এই কাজগুলো করতে করতেই একটি সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেন তারা। নাম দেন ‘ব্যাকরাব’। ১৯৯৬ সালের আগস্টে স্ট্যানফোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রথম এই সার্চ ইঞ্জিনটি ব্যবহারের জন্য আসে। তবে ১৯৯৭ সালেই নিজেদের যৌথ উদ্ভাবনের নাম পাল্টে ‘গুগল’ রাখেন ল্যারি এবং সার্গেই। 

গুগলের নাম গুগল কেন?

এমন প্রশ্ন আপনার মাথায় আসতেই পারে। ল্যারি এবং সার্গেই-এর জন্য গুগল শুধু একটি শব্দ ছিলো না, এর পেছনে আছে যথার্থ অর্থও। ‘গুগল’ বলতে মূলত ১ সংখ্যাটির পরে ১০০টি শূন্যকে বোঝায়। নিজেদের তৈরি করা সার্চ ইঞ্জিনের ক্ষমতার বিশালতা বোঝাতেই এমন নাম দেন তারা। 

ল্যারি এবং সার্গেই কিন্তু ‘গুগল’ তৈরি করেছিলেন নিছক পড়াশোনার কাজে এবং আনন্দের জন্য। তাই, কাজ শেষ হয়ে গেলে তারা এই সার্চ ইঞ্জিনকে বিক্রি করে দিতে চান। ১৯৯৭ সালে তখনকার সবচাইতে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন ছিলো ইয়াহু! গুগল নিয়ে আর সামনে আগানোর ইচ্ছা না থাকায় ইয়াহু কেই ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে গুগল কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন ল্যারি এবং সার্গেই। ইয়াহু তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়। তবে হতাশ না হয়ে ২০০২ সালে আবার গুগল ইয়াহুর কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করেন ল্যারি ও সার্গেই। এবারেও ব্যর্থ হন তারা। ইয়াহু গুগলকে কিনতে চায়নি।

গুগল যেভাবে আজকের গুগল হলো

বারবার ইয়াহুর কাছ থেকে ফিরে এসে গুগল হাল ছাড়েনি। তখনকার স্ট্যানফোর্ডের অধ্যাপক ও সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর কাছে যান ল্যারি ও সার্গেই গুগলকে নিয়ে। এর মধ্যেই ১৯৯৮ সালের আগস্টে ‘সান মাইক্রোসিস্টেম’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি বেখটলশেইমের কাছ থেকে এক লাখ ডলার পায় গুগল। স্বল্প এই টাকা নিয়েই নিজেদের কার্যালয় শুরু করে গুগল। তাদের প্রথম এবং প্রধান কার্যালয় শুরু হয় ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানলো পার্কের একটি গ্যারেজে। এই গ্যারেজটি ছিলো ল্যারি এবং সার্গেই-এর বন্ধু সুসান ওজস্কির। সেসময় বন্ধুদের পাশে থাকা সুসানের কথা ভোলেননি ল্যারি বা সার্গেই। সুসান এখন ইউটিউবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। 

১৯৯৯ সালে গুগলে কিছুটা উন্নতি আসে। ফলে, গ্যারেজ থেকে উঠে পালো আল্টোর এক সাইকেলের দোকানের উপরের তলায় জায়গা নেয় গুগল। মাত্র সাতমাস পরেই মাউন্টেন ভিউয়ে কার্যালয় নেয় গুগল। সেখানেই এখন তাদের মূল কার্যালয়, যেটিকে ‘গুগল প্লেক্স’ নামে ডাকা হয়। একটু একটু করে আরো উন্নতি করতে থাকে গুগল। গুগলে বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিলো তখন। মোট ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পান গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ল্যারি এবং প্রেসিডেন্ট সার্গেই। তবে বিনিয়োগের সাথে সাথে আসে কিছু শর্তও। এমন বাচ্চা একজন নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে টাকা দিয়ে ভরসা পাচ্ছিলেন না তারা। তাই তাদের দাবী ছিলো ল্যারিকে সরিয়ে অন্য কাউকে এই পদে আনার। ল্যারি নিজ থেকেই কোম্পানির ভালোর কথা ভেবে সরে যান নিজের পদ থেকে। সেখানে আসেন সফটওয়্যার কোম্পানি ‘নভেল’ এর প্রাক্তন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরিক স্মিট। ল্যারি পেইজের স্থানে বসানো হয় তাকে। 

যুদ্ধ তখন শেষের পথে

২০০২ সালে ইয়াহুর কাছে গিয়েছিলো গুগল। তবে ২০০৪ সালে তাদের অবস্থা একেবারেই পাল্টে যায়। এই দু বছরের মধ্যেই এতো বেশি উন্নতি করে কোম্পানিটি যে, তাদের নাম শেয়ার বাজারে তোলা হয়। ল্যারি এবং সার্গেই- যাদের কষ্টে এতোদিন ধরে গুগল একটু একটু করে পথ চলছিলো, তারা হুট করেই কোটিপতি হয়ে যান! ল্যারি সিইও পদ থেকে সরে গিয়েছিলেন বটে। তবে কোম্পানির শেয়ার এবং সবধরণের ক্ষমতায় তার নাম ছিলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোম্পানির উন্নতি হওয়ার সাথে সাথে বদলাতে থাকে তার ভাগ্য। তবে ল্যারি পেজ যে এই সফলতার পর হাত গুটিয়ে বসেছিলেন তা নয়। সিইও পদ থেকে সরে গেলেও নিজের মতো কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। 

২০০৫ সালে অ্যান্ডি রুবিনের কাছ থেকে ‘অ্যান্ড্রয়েড’ নামের একটি কোম্পানি কিনে ফেলেন ল্যারি। তখনও কি বুঝতে পেরেছিলেন ল্যারি যে, তার এই সিদ্ধান্ত গুগলের পথচলাকে আরো অনেক বেশি বদলে দেবে? মানুষের কাছে গুগলকে কম্পিউটার থেকে সরিয়ে পকেটে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন তিনি। আর সেই চেষ্টার শুরুটাই ছিলো সিইও এবং প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি রুবিনের কাছ থেকে কিনে নেওয়া অ্যান্ড্রয়েড। সার্গেই এ ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। রুবিন আর ল্যারি মিলে মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করেন। তবে, ২০০৭ সালে স্টিভ জবস আইফোন নিয়ে এলে পিছিয়ে পড়ে অ্যান্ড্রয়েড। আর বড়ভাবে কাজ শুরু করেন ল্যারি এবং রুবিন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে অ্যান্ড্রয়েড পরিচালিত মোবাইল নিয়ে আসেন তারা। যেকোন মোবাইলের জন্য বিনামূল্যে গুগল ব্যবহারের অনুমতি দেন তারা। ফলে ২০১০ সালে অ্যান্ড্রইয়েড ব্যবহারের পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে যায়। সার্চ ইঞ্জিন এবং অ্যান্ড্রয়েডকে নিয়ে প্রচুর সফলতা পায় গুগল। বিশেষ করে, অ্যান্ড্রয়েড এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে ল্য্যারির। ২০১০ সালে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হয় গুগল। সেসময় প্রতিষ্ঠানটির কর্মীর সংখ্যা ছিলো ২৪,০০০।

সফলতার সাথে চলে এলো সমস্যাও

যেকোন ক্ষেত্রে সফলতা পেলে সেখানে কিছু সমস্যাও চলে আসে। গুগলের ক্ষেত্রেও এর ভিন্ন কিছু হয়নি। একই কাজের জন্য অনেক বেশি কর্মী থাকায় গুগলের কাজগুলো খুব ধীর হতে শুরু করে। গুগল থেকে অনেক বেশি মানুষ ধীরে ধীরে ফেসবুকে যোগ দেওয়া শুরু করে। সেসময় গুগলে কিছু নতুন ব্যাপার আনার কথা ভাবেন ল্যারি। ২০১১ সালে এরিক স্মিট সরে যান গুগল থেকে। নিজের পদে আবার ফিরে আসেন ল্যারি। আর তারপর থেকেই নানারকম নতুন সব জিনিস আনতে শুরু করেন তিনি গুগলে। মটোরলা, ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সার্ভিস, ল্যাপটপ ক্রোমবুক, মোবাইল ফোন গুগল পিক্সেল ও গুগল গ্লাসসহ নানারকম নতুনত্ব আনেন গুগলে ল্যারি। পরবর্তীতে অবশ্য ‘অ্যালফাবেট’ নামক একটি কোম্পানি তৈরি করেন ল্যারি। আর এর ভেতরেই গুগলকে নিয়ে আসেন। বর্তমানে মোট ৪০টি দেশে গুগলের ৭০টি কার্যালয় রয়েছে। আর গুগল ব্যবহারকারীর সংখ্যা? সে তো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে!

গুগল মানেই এখন যেন সবকিছু। গুগল ছাড়া যেন আমাদের জীবন চলেই না। জিমেইল – ইমেইল সেবা, গুগল ডকস, গুগল ট্রান্সলেট, গুগল প্লাস- এমন আরো কতকিছু রয়েছে গুগলে। বর্তমানে গুগলের সিইও হলেন সুন্দর পিছাই। তবে সাথে ল্যারি এবং সার্গেইকে নিয়ে গুগল এখনো পৃথিবীর অন্যতম সেরা সার্চ ইঞ্জিন হিসেবেই রয়েছে!

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …