Breaking News

চলচ্চিত্রের আত্মঘাতী নক্ষত্রদের গল্প

শিল্পীদের বলা হয় সমাজের দর্পন৷ আমাদের মৌলিক যতসব অনুভূতি আছে তাদের প্রকাশ ও রূপান্তরের কাজটি করে থাকেন শিল্পীরা ৷ তাতে কখনো বোধের উদয়, কখনো বোধের পূর্ণতা বা কখনো জীবনকেন্দ্রিক নতুন চিন্তাভাবনার ধারনা আমাদের মাঝে জাগ্রত হতে পারে ৷

চলচ্চিত্র অভিনেতারা শুধু যে অভিনয় করেন তা নয়, বরং আমাদের সমস্ত মানবিক বোধগুলো নিয়ে তারা রচনা করেন দৃষ্টিভঙ্গির নতুন মাত্রা, যা অনেক সময় আমাদের প্রচলিত জীবনযাত্রাকে আগাগোড়াই পাল্টে দেবার সক্ষমতা রাখে ৷

যে মানুষগুলো সাধারন দর্শকদের জীবন পাল্টে দিতে কাজ করেন, তাদের জীবন যদিও এতটা সহজে কখনোই কাটে না ৷ জীবনের নানা অসঙ্গতি, মানসিক চাপে তারা কতটা ভাল থাকেন বা ভাল থাকার অভিনয় করেন তা অনেক সময়ই আমাদের বোঝার অসাধ্য হয়ে দাঁড়ায় ৷

আজ থাকছে চলচ্চিত্র জগতের সেই সব নক্ষত্রদের গল্প, যারা জীবনের সাথে সঠিক বোঝাপড়ার অভিনয়টা ঠিকমত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথে হেঁটেছিলেন ৷

সালমান শাহ:

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে যে তারকা নিতান্ত অল্প সময়ের ভেতরে আবির্ভূত হয়ে গোটা জাতিকে তার সহজাত অভিনয় দক্ষতা এবং সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়া ফ্যাশনের মায়ায় মোহাবিষ্ট করে ফেলেছিলেন তার নাম সালমান শাহ ৷ ঢালিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মাঝে তার অভিষেক ঘটেছিল ৷ নবাগত নায়ক হয়েই তিনি ঢালিউডে পা রেখেছিলেন ৷ কিন্তু অভিষেকের পর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি ৷

সালমানের ফিল্ম ক্যারিয়ার ছিল সর্বসাকুল্যে চার বছরের ৷ এই চার বছরে সালমান শাহ মোট ২৭ টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন , যার প্রায় সবকয়টিই ছিল দূর্দান্ত ব্যবসা সফল সিনেমা ৷ এর কারন হিসেবে সমালোচকরা পর্দায় সালমান শাহের আবির্ভাবের ধরনটিকে চিহ্নিত করেন ৷ গতানুগতিক গল্পের যে চিরচেনা নির্মান ছাঁচ তার ভেতরে সালমান উপস্থাপন ও অস্তিত্বে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ক্যারিশমাটিক হিরো যিনি স্টাইলে ও অভিনবত্বে সমস্ত আলো নিজের দিকে টেনে নিতে সমর্থ হয়েছিলেন ৷ আর তার সার্বিক ক্যারিয়ারের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় যে চরিত্রগুলোতে তিনি নায়ক হিসেবে অভিনয় করতেন তার সবকয়টিতেই তিনি যেন বেছে বেছেই কাজ হাতে নিতেন ৷ ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বিক্ষোভ’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘সুজন সখী’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘বিচার হবে’— তার সর্বাধিক ব্যবসা সফল সিনেমা ৷ সেসব চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত প্লে ব্যাকগুলো আজও সমানতালে শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছে ৷

সালমান শাহ ১৯৯২ সালে সামিরা হককে বিয়ে করেছিলেন ৷ সামিরার সাথে দাম্পত্য জীবন যখন সুখে কেটে যাচ্ছিল সালমানের ক্যারিয়ার তখন তুঙ্গে ৷ নায়িকা শাবনূরের সাথে তার প্রেমের গুঞ্জনে দাম্পত্যজীবনে অশান্তি শুরু হয় সালমান-সামিরার ৷ সালমানও ক্যারিয়ারে ঝক্কিঝামেলা পেরিয়ে তখন মানসিকভাবে ছিলেন মারাত্মক বিধ্বস্ত ৷ ঢালিউডে নিজের আকাশ সমান এই জনপ্রিয়তার মধ্যেই ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটন রোডে নিজের বাসা থেকে সালমান শাহর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে পিবিআই বিবৃতি দেয় পারিবারিক অশান্তির কবলে পড়েই এই মেধাবী অভিনেতা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন ৷

সালমান শাহ’র মৃত্যুতে গোটা দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ৷ সালমানের মৃত্যুতে তার ভক্তদের আত্মহত্যার কথাও জানা যায় ৷ ১৯৯৬ সালের বিখ্যাত ‘টাইম ম্যাগাজিনে’ও সালমানের মৃত্যুর খবরটি উঠে এসেছিল ৷

সালমান শাহ চলে যাবার পর এখনো দর্শক মহলে তার জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মত৷ বাংলাদেশের অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমীরা আজও মনে করেন সালমান অসময়ে চলে না গেলে এই দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আজকে হয়তো আরো সুপ্রতিষ্ঠিত কোন অবস্থানে থাকতে পারতো ৷

সুশান্ত সিং রাজপুত:

বলিউডের মেধাবী তরুন অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত বিহারের পাটনায় জন্মগ্রহন করেন ৷ ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার দিকে মারাত্মক ঝোঁক ছিল এই প্রতিভাবান অভিনেতার ৷ ২০০৩ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অধিকার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন সুশান্ত৷ তারপর দিল্লী কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন তিনি৷ ছোটবেলা থেকেই গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি সুশান্তের আলাদা রকম একটা টান ছিল৷ তিনি ভারতের ফিজিক্স অলিম্পিয়াডের একসময়কার ন্যাশনাল উইনার ছিলেন ৷

ধীরে ধীরে নাচ, অভিনয় সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে শুরু করেন সুশান্ত এবং একজন মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার থেকে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হবার দিকে তার ক্যারিয়ারের গতিপথ পাল্টে ফেলেন৷

থিয়েটারে কিছুদিন কাজ করবার পর নেসলের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুযোগ আসে তার কাছে৷ কাজের সুবাদেই আস্তে আস্তে বিনোদন জগতের প্রিয়মুখ হয়ে উঠেন এই মেধাবী হাস্যোজ্জ্বল প্রতিভাবান অভিনেতা৷ তবে তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ‘কিস দেশ মে হ্যায় মেরা দিল’ নামের টিভি সিরিয়ালে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে৷ তারপর আরো কয়টি সিরিয়ালে অভিনয়ের পর একটি ডান্স রিয়েলিটি শো’তে অংশগ্রহন করেন তিনি৷ সেখান থেকেই চলচ্চিত্রে ডাক পান৷

সুশান্ত সিংয়ের বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে ঔপন্যাসিক চেতন ভগত’র ‘থ্রি মিস্টেকস অফ মাই লাইফ’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি অভিষেক কাপুরের সিনেমা ‘কাই পো চে’ তে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ৷ ২০১৪ সালে এই সিনেমা মুক্তির পর পরই ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে ৷ সেই সিনেমায় অসামান্য অভিনয়ের জন্য অভিষেকেই বাজিমাত করে সুশান্ত জিতে নেন সেরা নবাগত অভিনেতার অ্যাওয়ার্ড৷

তারপর একে একে ‘শুদ্ধ দেশি রোমান্স’, ‘পিকে’, ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’, ‘এম এস ধোনী: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’, ‘রাবতা’, ‘ওয়েলকাম টু নিউইয়র্ক’, ‘কেদারনাথ’, ‘সোঞ্চিরিয়া’, ‘ছিঁচোরে’র মত চলচ্চিত্রগুলোতে সুশান্ত হাজির হন আলাদা আলাদা চরিত্রের ভূমিকায় ৷ ‘পিকে’, ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’, ‘এমএস ধোনী: দ্য আনটোল্ড স্টোরী’— সিনেমাগুলো ব্যবসায়ীক অর্জনের দিক থেকে তো বটেই, অভিনয়ের জন্যও সুশান্ত ব্যাপক নাম কুড়িয়ে নেন দেশ বিদেশের লক্ষ লক্ষ দর্শক মহলে ৷

অভিনয় জীবন দূর্দান্ত কাটলেও প্রেমিকা অঙ্কিতার সাথে ছাড়াছাড়ির পর জীবন নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন এই অভিনেতা ৷ নেপোটিজমের উদ্বিগ্নতা তার ভেতরেও ছিল ৷ তবু সব পাশ কাটিয়ে জীবনকে আরো গুছিয়ে চলার প্রত্যয় ছিল তার ভেতরে৷ ভারতের বিভিন্ন জাতীয় দূর্যোগে দাতার ভূমিকাতেও বেশ ক’বার দেখা গেছে এই অভিনেতাকে ৷ কিন্তু বিগত ছয়মাস ধরে তীব্র ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন সুশান্ত ৷ গত ১৪ই জুন নিজ বাসায় তার লাশ পাওয়া যায় ৷ গলায় দড়ি দিয়ে তার আত্মহত্যার রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি ৷

জিয়া খান:

জিয়া খান ১৯৮৮ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহন করেন৷ ‘দিল সে’ সিনেমায় শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বলিউডে তার অভিষেক ঘটে ৷ তার মা রাবিয়া আমিনও একসময়কার ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন ৷

জিয়ার যখন মাত্র ২ বছর বয়স, তখন তার পিতামাতার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে ৷ ছোটবেলা থেকেই এই বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়টি জিয়াকে মনে মনে কষ্ট দিত ৷ তার পারিবারিক নাম ছিল নাফিসা খান ৷ ২০০৭ সালে অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে ‘নিঃশব্দ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সময় তিনি নিজের নাফিসা খান নামটি পরিবর্তন করে জিয়া খান নামটি গ্রহন করেন ৷ ‘নিঃশব্দ’ চলচ্চিত্রটিকেই জিয়া খানের ফিল্মি ক্যারিয়ারের প্রধানতম ব্রেক হিসেবে সমালোচকরা বিবেচনা করেন৷

জিয়া শুধু যে অভিনয়ে পারদর্শী ছিলেন তাই নয়, একাধারে নাচ ও গানেও তার পারদর্শীতা ছিল বেশ চোখে পড়ার মত৷ কিন্তু এত সব গুণাবলী থাকা স্বত্ত্বেও ভাগ্য যেন বরাবরই বিপরীত আচরন করেছে এই মেধাবী অভিনেত্রীর সাথে ৷

২০০৪ সালে মুখেশ ভাট যখন তার ‘তুমসা নেহি দেখা’ চলচ্চিত্রটি তৈরি করছেন, মুখেশের প্রথম পছন্দ হিসেবে ছিলেন জিয়া খান ৷ কিন্তু বয়স বিবেচনায় তিনি মুখেশের চলচ্চিত্র থেকে বাদ পড়ে যান ৷ পরবর্তীতে বলিউডের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা ‘গজনী’তে তার অসাধারন অভিনয় ব্যাপক জননন্দিত হয়েছিল৷

জিয়া ছিলেন বলিউডের নেপোটিজমের স্বীকার৷ এটি তার ব্যক্তিগত জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল ৷ জিয়ার সাথে বলিউডের অভিনেতা আদিত্য পাঞ্চোলি’র ছেলে সুরাজ পাঞ্চোলির প্রেমের সম্পর্ক ছিল ৷ কিন্তু সেই সম্পর্ক এতটা সুখকর ছিলো না ৷ সুরাজ কর্তৃক বঞ্চনায় অতীষ্ট হয়ে জিয়া ২০১৩ সালের ৩রা জুন গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন৷ তার এই আকষ্মিক চলে যাওয়া বলিউডকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলো ৷

মেরিলিন মনরো:

আজও যেই স্বর্ণকেশী রূপসীর আশ্চর্য্য লাস্যময়ী রূপ, হৃদয়চেরা হাসিতে পুরো পৃথিবী হতবিহ্বল, তার নাম মেরিলিন মনরো ৷ মনরোকে বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট ফিমেল স্টার অফ অল টাইম’ ৷ জন্মেছিলেন ১৯২৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে৷

বাবা নিউটন বেকার ও মা গ্লাডিস পার্ল বেকারের তৃতীয় সন্তান ছিলেন মেরিলিন মনরো ৷ মনরোর জন্মের ২ বছর পর মার্টিন গ্লাডিসের বিচ্ছেদ ঘটে ৷ এবং ছোট্ট মনরোকে নিয়ে অনেকটা অকূল পাথারে পড়ে যান তরুণী মা গ্লাডিস ৷ সেইসময় গ্লাডিস মানসিক ভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়েন এবং শোনা যায় দুই বছরের ছোট্ট শিশু মনরোকে সে সময় তিনি বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন ৷

মনরো বড় হয়েছিলেন চাইল্ডহোমে ৷ এতিমখানা থেকে উঠে আসা মনরো নিজের নিয়মতান্ত্রিক একঘেঁয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে ১৯৪২ সালে বিয়ে করেন জেমস ডগার্থিকে ৷ স্বামীর সুবাদে বিমানের একটি পার্টস কোম্পানিতে তিনি চাকরি পান ৷ নিজের রূপ লাবণ্যের বদৌলতে সেই কোম্পানিরই পোস্টার গার্ল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মেরিলিন মনরো ৷ তারপর একে একে পত্রিকা, বিভিন্ন এজেন্সির সাথে তিনি চুক্তিবদ্ধ হতে থাকেন উঠতি মডেল হিসেবে ৷ তখুনি সাংসারিক বনিবনা না হওয়ায় স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটে তার ৷

বড় পর্দায় মনরো’র অভিষেক ঘটে ১৯৪৬ সালে ৷ প্রাথমিক অবস্থায় এত সুবিধা করতে না পারলেও ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অল এবাউট ইভ’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে পাকাপাকি ভাবে তিনি হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করে নেন৷

পরের দুইবছর সময়টুকু হলিউডে কেবলই মনরো অধ্যায়ের আধিপত্য ৷ একের পর এক মুক্তি পেতে থাকে যৌন আবেদনময়ী মেরিলিন মনরো অভিনীত রাইট ক্রস, হোমটাউন স্টোরি, ক্ল্যাশ বাই নাইট, উই আর নট মেরিড, নায়াগ্রা, জেন্টেলম্যান প্রেফার ব্লন্ডিজ সহ দর্শক জনপ্রিয় সিনেমাগুলো ৷

নিজেকে খোলামেলা পোশাকে উপস্থাপনে যখন ব্যাপক সমালোচনার তীর তার দিকে ধেয়ে আসছিলো, মনরো সেগুলো পাত্তা না দিয়েই দখল করে নেন ‘প্লেবয়’ ম্যাগাজিনের কাভার পৃষ্ঠা৷

মেরিলিন মনরো যে শুধু মডেল বা নায়িকা ছিলেন তা নয়, সংগীত শিল্পী হিসেবেও বিভিন্ন গান গেয়ে সমাদৃত হয়েছেন এই মার্কিন ৷ ইতিমধ্যে বিয়ে করেন বন্ধু ডি মিয়াগো’কে, মনরোর স্বেচ্ছাচারী জীবনের কারনে সে বিয়েও ভেঙে যায় অল্প সময়ের ব্যবধানে ৷ তাতে মনরো আস্তে আস্তে জীবন নিয়ে হতাশ হতে শুরু করেন ৷

মাদক, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন সহ বিভিন্ন নেশা মনরোকে পেয়ে বসেছিল ৷ তৃতীয়বার বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন চিত্রনাট্যকার আর্থার মিলারকে সঙ্গী করে ৷ সুখী ছিলেন তারা, তবু জীবনের বেপরোয়া উত্তাল পদচারনা যখন মনরোকে মা হবার সুযোগটি দেয়নি তখন আরো ভেঙে পড়েন এই লাস্যময়ী নারী অভিনেত্রী ৷ ১৯৫৯ সালটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ৷ সেই বছর ‘সাম লাইক ইট হট’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মনরো জিতে নেন ‘গোল্ডেন গ্লোব’ অ্যাওয়ার্ড ৷ আর তার দু’বছর পরই মিলারের সাথে মতের মিল না হওয়ায় ডিভোর্স হয় তার ৷

ব্যাপক তারকা খ্যাতির পাশেও মনরো যেন ছিলেন চির একাকী ৷ অনেকের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু যেন কাউকেই তেমন করে পাশে পাননি ৷ তার প্রেমিকদের তালিকায় ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নামও ৷

একাকীত্ব ও হতাশা যেন পেয়ে বসেছিল মনরো’কে ৷ ১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট নিজের বাসভবনে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় মনরো’কে ৷ তার একহাতে ছিল রিসিভার,অন্য হাতে ঔষধের খালি বোতল ৷ রিসিভার হাতে নিয়ে নিজের ভেতর তুমুল একাকী কথাগুলো মনরো কাকে বলতে চেয়েছিলেন— সে রহস্যের আজও কোন সমাধান হয়নি ৷

রবিন উইলিয়ামস:

বিখ্যাত মার্কিন অভিনেতা ও স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান খ্যাত রবিন উইলিয়ামস ১৯৫১ সালে আমেরিকার শিকাগোতে জন্মগ্রহন করেন ৷ ছোটবেলা থেকেই রবিন উইলিয়ামস অনেকটা চুপচাপ স্বভাবী ছিলেন ৷ চট করেই কারো সাথে মিশতে পারার গুণটি তার মাঝে ছিলো না ৷ তবে অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই রবিনের ছিল অভিনয়ের প্রতি এক ধরনের দূর্দান্ত আকর্ষণ ৷ তার প্রমাণ মিলে তার বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনের গোড়ার দিকে ভাল করে দৃষ্টিপাত করলে ৷

স্কুলে পড়ার সময়েই নিজের চুপচাপ স্বভাবটি তিনি কাটিয়ে উঠেন স্কুলের নাটক দলে যোগদানের মাধ্যমে৷ তিনি যখন নিউইয়র্কের জুইলিয়ার্ড স্কুলে পড়তে চলে যান, সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় ‘সুপারম্যান’খ্যাত অভিনেতা ক্রিস্টোফার রীভের ৷ রীভ আর রবিন উইলিয়ামস সেখানে পরস্পরের রুমমেট ছিলেন কিছুদিন ৷

সত্তর দশকের শুরুর দিক থেকেই নিজের স্ট্যান্ডআপ কমেডির দক্ষতার জোড়ে পৃথিবী ব্যাপী ব্যাপক সুনাম কুড়াতে শুরু করে এই মেধাবী অভিনেতা৷ সে সুবাদেই ১৯৭৮ সালে তিনি টেলিভিশনে নিজের একক স্ট্যান্ড আপ কমেডি অনুষ্ঠান ‘মর্ক এন্ড মাইন্ডি’ আয়োজনের সুযোগ পান ৷ এটিই ছিল বিনোদন জগতে রবিনের প্রথম আবির্ভাবের স্বতন্ত্র জোয়ারের স্মারক ৷

এরই মাঝে ‘Good Will Hunting’ সিনেমায় নিজের তুখোড় অভিনয়ের জন্য ১৯৯৭ সালে রবিন উইলিয়ামস জিতে নেন মূল্যবান অস্কার অ্যাওয়ার্ড ৷ তবে শুধু পর্দার সামনেই নয়, পর্দার পেছনেও তিনি কন্ঠ দিয়েছেন ‘Aladdin’ সিনেমায়৷ সেখানকার ‘জিনি’ চরিত্রটি রবিন উইলিয়ামসেরই কন্ঠস্বর ৷

এত এত চলচ্চিত্রের নানা বৈচিত্র্যময় ক্যারেক্টারের ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে কখন যে নিজের অজান্তেই জীবনের সাথেও অভিনয় শুরু করে দিয়েছিলেন তার হদিস কেউ জানেনি ৷ মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়েন এই শক্তিমান অভিনেতা ৷ ব্যক্তিগত জীবনও স্বস্তিতে ছিলেন না তিনি৷ দাম্পত্য জীবনে থেকেও তার নামে মাঝে মাঝেই অন্য নারীদের সাথে প্রণয়ের গুঞ্জন ও সম্ভাবনা তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায়৷ মাদকের সাথে রবিনের সখ্যতা এরপর ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে৷ তিনি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি দেশ ঘুরে ঘুরে স্ট্যান্ড আপ কমেডিও চালিয়ে যেতে থাকেন ৷ কিন্তু মাদকের প্রভাবে প্রাথমিক দফায় শ্বাস কষ্টে পড়লেও একটা সময় মানসিক ব্যাধীতে তিনি আক্রান্ত হন ৷

সে সব কিছুর খেসারত অবশেষে মৃত্যু দিয়েই তিনি মিটিয়েছিলেন ৷ ২০১৪ সালে ৬৩ বছর বয়সে রবিন উইলিয়ামস নিজ ঘরে গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন৷ হলিউড সে ধাক্কা আজ অবধি সামলে উঠতে পারেনি ৷

জীবন নদীর স্রোত সবসময় একই রকম থাকে না ৷ সাধারন মানুষদের তুলনায় শিল্পীদের জীবনে চাহিদার সাথে প্রাপ্তির দ্বন্দ্ব আরো জোড়ালো ভাবে কাজ করে কারন শিল্পীরা অনেক সময়ই নিজের ব্যক্তি জীবন ও শিল্প জীবন আলাদা করতে হিমশিম খেয়ে যান ৷ তবুও আত্মহত্যা কোন সমাধান নয় ৷ চলে গেলেও কাজ থেকে যায় ৷ সেই থেকে যাওয়া কাজই হয়তো যুগ যুগ সেসব নক্ষত্রদের মনে করাবে ৷ শিল্পবোধ সম্পন্ন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মনে তারা সেভাবেই টিকে থাকবেন, যেখাবে ভাল কাজ রয়ে যায় নিজস্ব গুণের ক্ষমতাবলে ৷ ভালো থাকুন বড় পর্দার হারিয়ে যাওয়া সেই কীর্তিমান নক্ষত্রেরা ৷

Total Page Visits: 396 - Today Page Visits: 7
😡😡ANTI-PIRACY WARNING 😡😡 This content's Copyright is solely owned by Durbin Multimedia.
error: Content is protected !!
Don`t copy text!