চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ : সেরা ৫ টি চলচ্চিত্র

বাংলাদেশের জল-হাওয়া যে কয়জন সাহিত্যিককে তৈরি করেছে হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের ভেতর অন্যতম৷ বাংলাদেশের সাহিত্য পরিমন্ডল তাঁর হাত ধরেই সম্পূর্ণ নতুন পরিচিত লাভ করেছে ৷ মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রাকে পটভূমি করে সংলাপপ্রধান সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে হুমায়ূনের সমকক্ষ দুই বাংলায় আর কেউই নেই৷ তবে শুধু সাহিত্যই না, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অনন্য কীর্তির স্বাক্ষর চলচ্চিত্রেও রেখেছেন নিজের মত করে, সমানতালে৷ সাহিত্যিক ছাড়াও চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার পরিচয়গুলো তাঁর চলচ্চিত্রের সুবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে শিল্পপ্রিয় মানুষের মনে৷

১৯৯৪ সালে নির্মিত তাঁর প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র “আগুনের পরশমনি” থেকে শুরু করে শেষ চলচ্চিত্র  “ঘেটু পুত্র কমলা” পর্যন্ত তিনি যে আটটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন—  তার সবকয়টিই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে ব্যাপক আলোচিত চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে৷ আজ আমরা চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে,তাঁর ৫ টি বিখ্যাত চলচ্চিত্র  নিয়ে আলোচনা করব৷

১) আগুনের পরশমনি:

“আগুনের পরশমনি” হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র৷ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে৷ মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি বানিয়ে এই দেশে খুব বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি৷ হুমায়ূন আহমেদের “আগুনের পরশমনি” বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের উপর নির্মিত সেরা চলচ্চিত্রগুলোর একটি৷ নিজের উপন্যাস অবলম্বনে হুমায়ূন আহমেদ উক্ত চলচ্চিত্রটি নির্মান করেছিলেন৷

চলচ্চিত্রটির কাহিনীতে ১৯৭১ সালের মে মাসের যুদ্ধ উত্তপ্ত দিনগুলোয় একটি পরিবারের সদস্যরা যে আতঙ্কে দিনাতিপাত করছিলো তাকে কেন্দ্র করে পুরো চলচ্চিত্রটিকে আবর্তিত হতে দেখা যায়৷ মুক্তিযুদ্ধ, গেরিলা যোদ্ধাদের অংশগ্রহন ও সাধারন জনমনে মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক উদ্বিগ্নতার ছাপ চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর থেকে আজ অবধি চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের বিষ্ময়ের ভেতর রেখেছে৷

“আগুনের পরশমনি” যে বছর মুক্তি পেয়েছিল সেই বছর আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে৷ এই চলচ্চিত্রটি নির্মানের জন্যই হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন৷

২) শ্রাবন মেঘের দিন:

“শ্রাবণ মেঘের দিন” হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র যেটি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র নির্মানের ৫ বছর পর, ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায়৷ এই চলচ্চিত্রেই প্রথম কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনার পাশাপাশি একজন সফল গীতিকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের আত্মপ্রকাশ ঘটে৷ এই চলচ্চিত্রটিও হুমায়ূন আহমেদ নিজের উপন্যাস অবলম্বনেই তৈরি করেছিলেন৷

চলচ্চিত্রের কাহিনীতে দেখা যায় একটি অজপাড়া গ্রামের গায়ক মতির প্রতি সে গ্রামেরই এক কিশোরী কুসুমের মনে প্রেমভাব উদয় হয়৷ কুসুম মনে মনে মতিকে চাইলেও মতি দূর্বলতা অনুভব করে সে গ্রামে বেড়াতে আসা সম্ভ্রান্ত জমিদারেন নাতনি ডাক্তার শাহানার প্রতি৷ কুসুমের বাবা এর ফাঁকে কুসুমের বিয়ে ঠিক করে উজানের ছেলে সুরুযের সাথে৷ এ নিয়েই গোটা চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন মাত্রায় আবর্তিত হয়েছে৷

“শ্রাবণ মেঘের দিন” ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চল ভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র, যেখানে ভাটির সাধারন মানুষের সুখ-দুঃখ, অনুভূতির মিশ্র আবেশ প্রবলমাত্রায় দর্শকদের স্পর্শ করেছিল৷ এই চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেছিলেন জাহিদ হাসান, শাওন, মাহফুজ আহমেদ, গোলাম মোস্তফা সহ প্রমূখ বিদগ্ধ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ৷

১৫০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটিতে লোকসাধক উকিল মুন্সীর এবং হুমায়ূনের নিজের লেখা কিছু গান ব্যবহৃত হয়েছে যা আজও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত৷ মুক্তির পর পর এই চলচ্চিত্র ৭টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য নির্মিত হয়েছিল৷

৩)চন্দ্রকথা:

“চন্দ্রকথা” মুক্তি পায় ২০০৩ সালে ৷ এই চলচ্চিত্রটিতেও কাহিনী, চিত্রনাট্য, অনন্য গীতিকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ সমালোচক ও দর্শক মহলে প্রবল খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ৷

“চন্দ্রকথা” চলচ্চিত্রটিতে একজন রাশভারি জমিদারকে দেখা যায়৷ চন্দ্র নামের একটি মেয়ে ও তার খালাতো ভাই জহির নামের একটি ছেলে— দুজন দুজনকে ভালবাসে৷ কিন্তু ঘটনাপ্রসঙ্গে সেই জমিদারের সাথে চন্দ্রের বিয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়৷ ১৪২ মিনিটের পুরো চলচ্চিত্রটিই গ্রামীন প্রেক্ষাপটে তৈরি৷ এই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গানগুলো, যা হুমায়ূন আহমেদ রচনা করেছেন, বাংলা চলচ্চিত্র জগতের প্লে ব্যাকের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত করা যায়৷

চন্দ্রকথা চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান নূর, শাওন, ফেরদৌস ও আহমদ রুবেল৷ এই চলচ্চিত্রের জন্য আহমদ রুবেল এবং শাওন ৬ষ্ঠ মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সমালোচনা পুরস্কার শাখায় যথাক্রমে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেত্রী বিভাগে পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

৪) শ্যামল ছায়া:

মুক্তিযুদ্ধ বারবারই হুমায়ূনের চিন্তা চেতনায় ও শিল্পে ঘুরে ফিরে এসেছে৷ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অমর গাঁথা “জোছনা ও জননীর গল্প” যেমন সাহিত্য জগতের ধ্রুপদী অলংকার তেমনি তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র “শ্যামল ছায়া” চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম “মাস্টারপিস”৷

” শ্যামল ছায়া “— মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র৷ কিন্তু সেখানে যুদ্ধের দৃশ্য নেই৷ সেখানে মৃত্যু নেই, রক্ত- লাশ কিছু নেই, আছে যুদ্ধকালীন ভয়াবহ অস্থিরতা ও উদ্বিগ্নতার দিনগুলোতে একদল মানুষের প্রচন্ড বিধ্বস্ত মনোবলের ইতিকথা৷ তাদের ঠিকানা বিহীন যাত্রার গল্পের উপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রে আমাদের জাতিগত দুঃখের দিনগুলোতে সমস্ত মানসিক টানাপোড়নের ইতিবৃত্ত বারবার দর্শককে ব্যাকুল করে তুলে৷ এমন ব্যাকুলতা, দুঃখবোধ, যুদ্ধকালীন বিষণ্ণতা বাংলা সিনেমায় হুমায়ূনের আগে কেউ এত চমৎকার করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন কি না সন্দেহ আছে৷

ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটির শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেছেন রিয়াজ, শিমুল, আহমদ রুবেল, এজাজুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, স্বাধীন খসরু, চ্যালেঞ্জার, শাওন, তানিয়া আহমেদ সহ প্রমুখ অভিনয় শিল্পীরা৷ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ থেকে বেস্ট ফরেন ফিচার ফিল্ম হিসেবে “একাডেমি পুরস্কার” এর জন্য নির্বাচিত হয়েছিল৷

৫) ঘেটু পুত্র কমলা:

“ঘেটু পুত্র কমলা”— হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র৷ চলচ্চিত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তির আগেই ১৯শে জুলাই, ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে, একমাসের জন্যে দেশে ফিরে পুনরায় নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে ৩০ মে ২০১২ তারিখে তিনি ছবিটি দেখে যেতে পেরেছিলেন। 

“ঘেটু পুত্র কমলা” ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত একটি চলচ্চিত্র যেখানে একটি ঘেটু দলের একজন ঘেটু’র জীবন সংগ্রাম সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে৷ ভাটি অঞ্চলের জমিদাররা পানিবন্দী বর্ষাকালে আমোদ প্রমোদের জন্য ঘেটু দল ভাড়া করত৷ দলটি গোটা বর্ষাকাল জমিদারের মনোরঞ্জনের ফলে একটা ভাল পারিশ্রমিক পেত৷ প্রতিটি ঘেটু দলেই একটি ছোট ছেলে থাকে, যে মেয়েদের পোশাক ও অঙ্গভঙ্গিতে মেয়ে চরিত্রে নাচ গান করে৷ সেই ঘেটু ছেলেদের সাথে জমিদারদের যৌনতার সম্পর্ক থাকতো৷ তেমনই এক ঘেটু ছেলের সাথে এক জমিদারের এমন ধরনের সম্পর্ক, পারিবারিক ভাবে তার প্রভাব ও আবহে পুরো চলচ্চিত্রটি নির্মান করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ৷

৮৫তম অস্কার প্রতিযোগিতার আসরে ‘সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিল “ঘেটু পুত্র কমলা”৷

উপরিউক্ত ৫ টি চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও নতুন মাত্রার৷ এই ছবিগুলো ছাড়াও তাঁর “দুই দুয়ারী”, “আমার আছে জল” সিনেমাগুলোও প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল মুক্তির সাথে সাথে৷

হুমায়ূনের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু সহজাত অনুভবের ভিতর দিয়ে গেলেও অসম্ভব রস সমৃদ্ধ সংলাপে এবং মনমুগ্ধকর সংগীত আয়োজনে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা৷ এবং এই কারনেই হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যিক হিসেবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একজন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও আজীবন শিল্পপ্রিয় ও চলচ্চিত্র পাগল মানুষের মনের মণিকোঠায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন৷

Check Also

মেরিলিন মনরোর মেকআপ

মেরিলিন মনরোর মেকআপ রহস্য!

মেরিলিন মনরো, শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রী। এখনও যার নাম মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত …