পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ১০ টি দেশের কথা

পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ১০ টি দেশের কথা

সুখ, ছোট্ট একটি শব্দ হলেও বিশ্বের প্রতিটি মানুষ মূলত এই সুখের তাড়নাতেই প্রতিদিন সকাল শুরু করে৷ সুখের অর্থ একেকজনের কাছে একেক রকম। তবে সুখী দেশের অর্থ বেশ বোধগম্য। সম্প্রতি স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপন, নাগরিকদের পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতিমূলক মনোভাব, নিজস্ব স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দূর্নীতির প্রভাবের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দশটি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে “ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট” ৷ বিশ্বের সর্বোচ্চ ধনী দেশগুলোর নাম এই তালিকায় না দেখে অবাক হবেন না কিন্তু! কারণ সুখী আর ধনী দুইটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থ বহন করে। 

চলুন, এবার জেনে নেই বিশ্বের সুখী দেশগুলোর কথা।

১০) অস্ট্রিয়া : ইউরোপের হৃদয়খ্যাত অস্ট্রিয়ার রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং জনপদের সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্য ৷ জনগনের মধ্যকার আন্তঃসামাজিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যক্তি স্বাধীনতা চর্চার উন্নত সুযোগ প্রদান অস্ট্রিয়াকে পৃথিবীর বুকে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্থান দিয়েছে ৷ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাকে বলা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বসবাসযোগ্য শহর ৷ একটি সার্ভেতে দেখা গেছে, অস্ট্রিয়ার শতকরা ৭৩ জন, তাদের নাগরিক সুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট ৷ এর একটা বড় কারন, অস্ট্রিয়ায় অপরাধ প্রবণতার হার খুবই কম ৷ আল্পস পর্বতসহ বিষ্ময়কর,বৈচিত্রপূর্ণ নানান নিদর্শন অস্ট্রিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে একটি ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে ৷

৯) কানাডা : নাগরিকদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সুবিধা এবং শতভাগ সামাজিক নিরাপত্তা দেয়া দেশ কানাডা, পৃথিবীর সুখী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ৷ সারা পৃথিবীর সংস্কৃতির সাথে নিজেদের একাত্ম রাখবার মানসিকতা কানাডার জনগনদের মধ্যে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটিকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে ৷ কানাডাই একমাত্র দেশ যেখানে গ্রাম ও শহরে সুখের ছোঁয়া একই রকম ৷ বলা যায় সম্প্রীতি শব্দটির একটি অনন্য উদাহরণের নাম, কানাডা ৷

৮) নিউজিল্যান্ড : একটি প্রচলিত রসিকতা শোনা যায় নিউজিল্যান্ডবাসীদের নিয়ে ৷ তারা কাজে আছেন না ছুটিতে আছেন, এটা নাকি তাদের দেখলে আন্দাজ করা মুশকিল ৷ বিষয়টি আসলে অনেকটা এরকমই৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আয়ের সুবিধা৷ তবে চমৎকার “ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স” দক্ষতার জন্য নিউজিল্যান্ডকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ ৷ ক্রিকেট,বাঞ্জি ডাইভিং,জেট স্কেটিং,স্কাই ডাইভিং নিয়ে মত্ত নিউজিল্যান্ডবাসী চমৎকার ভোজন রসিকও বটে ৷ সুন্দর জলবায়ু, দূষণমুক্ত পরিবেশ, সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধায় থাকা মানুষগুলো  কখনোই সামাজিক প্রতিপত্তি বা নিজস্ব অর্জন নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়না ৷ সম্ভবত একারনেই তারা তাদের সুখে থাকবার বিষয়টি দিনের পর দিন ধরে রেখেছে ৷

৭) সুইডেন: নর্ডিক দেশগুলোর মধ্য সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধার দেশ সুইডেন। যাকে বলা হয়, তরুনদের জন্য পৃথিবীর আদর্শ পরিবেশের দেশ ৷ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে সুইডিশ সরকারের নেয়া প্যারেন্টাল লিভ পলিসি, ফ্রি স্কুলিং সিস্টেম জনজীবনে স্বস্তির আরেক নাম। সম্পূর্ণ বিনাখরচে দেয়া উন্নত স্বাস্থ্য সুবিধা তাদের জীবনকে সবচেয়ে সহজতর করে তুলেছে ৷ সুইডেনের নাগরিকদের গড় আয়ু এ কারনেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ৷ শিশুর বিকাশের পথে উপযুক্ত সহায়তা প্রদানের জন্য সুইডেনকে বলা হয় বেবি ফ্রেন্ডলি কান্ট্রি ৷ এছাড়া গর্ভবতী মায়েদের জন্য পৃথিবীর পঞ্চম আদর্শতম স্থান বলা হয় সুইডেনকে ৷

৬) সুইজারল্যান্ড : পৃথিবীর সবচেয়ে “ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি” দেশ বলা হয় সুইজারল্যান্ডকে ৷ বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের তালিকায় থাকা সুইজারল্যান্ড সাধারনত সকল প্রকার রাজনৈতিক ঝামেলা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে ৷ দেশটিতে পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার আধিক্য বেশ চোখে পড়ার মতই ৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর এই দেশটির নাগরিকদের গড় আয়ু প্রায় ৮৩ বছর ৷ সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা বহুভাষী ৷ বিশ্বজোড়া নানাবিধ সংস্কৃতির প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ সারা পৃথিবীর মানুষকেই দেশটি সমন্ধে আগ্রহী করে তুলেছে৷ এছাড়া নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য তো আছেই।

৫) নেদারল্যান্ডস : নাম শুনতেই মনোমুগ্ধকর টানা টিউলিপের বাগান আর আয়েশী উইন্ডমিলের চিরচেনা ছবি নেদারল্যান্ডসকে হয়তো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনা ৷ জানেন কি, পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস কিন্তু নেদারল্যান্ডসের জনগনের ৷ আদর্শ পুষ্টিকর খাদ্যের চলমান যোগানই এখন পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসবাসীদের সুখের মূল কারন হিসেবে কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন ৷ অবকাঠামোগত উন্নয়নে পৃথিবীর শীর্ষস্থানে অবস্থান করা এই দেশটির ভেতর যে কেউ এতই নিরাপদে চলাচল করতে পারে যে একে পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ স্থান বলা হয়। চলাচলের জন্য এদেশের অধিকাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে। মজার ব্যপার হোলো, দেশটিতে ঘরের চেয়ে সাইকেলের সংখ্যাই বেশি ৷ নাগরিকদের বৈচিত্রপূর্ণ জীবনযাত্রার প্রতি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও অভ্যস্ততা, নেদারল্যান্ডসকে দিয়েছে পৃথিবীর পঞ্চম সুখী দেশের তকমা ৷

৪) আইসল্যান্ড : সারা পৃথিবী জুড়ে যখন নারীরা ব্যাপক লিঙ্গবৈষম্যের স্বীকার সেখানে আইসল্যান্ডকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নারীবান্ধব দেশ ৷ মাত্র সাড়ে তিনলক্ষ মানুষ আর অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ বেষ্টিত এই ছোটখাটো দেশটিতে লিঙ্গ বৈষম্যের হার শূন্যের কোঠায় ৷ লো ইনকাম ট্যাক্স, বিনামূল্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্যসুবিধা এবং সেইসাথে উন্নত শিক্ষার নিশ্চয়তাই মূলত আইসল্যান্ডের মানুষদের সুখী হবার কারন ৷ সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে আইসল্যান্ডের অবস্থান সবার উপরে৷ একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে শতভাগ শিক্ষার হার সমৃদ্ধ দেশটির প্রতি দশজনের একজন লেখক, অর্থাৎ তার নিজের লেখা বই আছে ৷ 

৩) নরওয়ে : নিশীথ সূর্যের দেশ খ্যাত নরওয়েকে বলা হয় ইউরোপের সবচেয়ে সুন্দর দেশ ৷ স্ক্যান্ডেনেভিয়ান এই দেশটির রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ৷ খনিজ সম্পদে ভরপুর নরওয়েবাসীর মধ্যে দূর্নীতির হার প্রায় শূন্যের ঘরে ৷ নিজেদের নবায়নযোগ্য সম্পত্তিগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার করে নরওয়েবাসীরা অনেক দিন ধরেই নিজেদের দারিদ্রতার হারকে দমিয়ে রেখেছে। নরওয়েতে বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবার যে ব্যবস্থা রয়েছে সেটি বিশ্বের উল্লেখযোগ্য নাগরিক সেবার উদাহরণ। এছাড়া, সামাজিক সম্প্রীতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অবাধ সুযোগ নরওয়েকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুখী দেশ হিসেবে সম্মানিত করেছে ৷

আরোও পড়ুনঃ দুর্ধর্ষ ও সাহসী জাতি ‘মাসাই’ দের কাহিনী

২) ডেনমার্ক : ড্যানিশদেরকে যদি কেউ প্রশ্ন করে, “জীবনের অর্থ কী”, তাদের বেশিরভাগেরই উত্তর হবে ‘হিয়গা’ (Hyuga) ৷ শব্দটির সঠিক কোন অনুবাদ নেই ৷ তবে,উষ্ণ সম্পর্ক এবং সম্পর্কের গাঢ়ত্বের পরিমাপ নির্দেশ করে শব্দটি ৷ ড্যানিশদের সুখী থাকবার কারন হিসেবে অবশ্য অন্য একটি কারনকে চিহ্নিত করা হয়েছে ৷ ডেনমার্কের লিভিং কস্ট পৃথিবীর সবগুলো দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম, পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত রেস্টুরেন্টগুলোও ডেনমার্কেই ৷ ডেনমার্কের জেলগুলোতে কোন অপরাধী নেই ৷ মানুষজন শতভাগ শিক্ষিত হওয়ার কারনে সবাই নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন ৷ উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা তো রয়েছেই, এর পাশাপাশি শতভাগ দূষনমুক্ত পরিবেশে তাদের মত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা জাতি পৃথিবীতে দুটি নেই ৷

১) ফিনল্যান্ড : ফিনল্যান্ডকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশ ৷ সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন জনসংখ্যা বিশিষ্ট ফিনল্যান্ডকে নিরাপদ দেশও বলা হয় ৷ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আমরা দেখি মায়েরাই সাধারনত সন্তানদের অনেক বেশি সময় দিয়ে থাকেন ৷ কিন্তু ফিনল্যান্ডে দেখা যায়, স্কুলগামী বাচ্চারা তাদের বাবার হাত ধরেই বেড়ে উঠছে ৷ যে দেশের মানুষ সততাকে সবচেয়ে স্বাভাবিক আচরন হিসেবে জ্ঞান করে সে দেশে কোন অন্যায় দূর্নীতির স্থান নেই ৷ মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস তাদের সমাজ গঠনের জায়গাটিকে পুরো পৃথিবীর বুকে একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে ৷ ফিনল্যান্ডের মানুষ পরিবেশ নিয়ে মারাত্মক সচেতন থাকায় ফিনল্যান্ডে পরিবেশ দূষনের হার শূন্য ৷ বহির্বিশ্বের সাথে ফিনল্যান্ডের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ গাঢ় তা তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দেখলে বোঝা যায় ৷ ফিনল্যান্ডের মানুষের মত ব্যক্তিস্বাধীনতা সচেতন মানুষ পৃথিবীতে আর একটিও নেই ৷

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …