পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে
পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে

আপনার বয়স কত? ৩০ বছর? পৃথিবী যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- এমন খবর ঠিক কতবার শুনেছেন আপনি? শুধু আপনি নন, এমন খবরের মুখোমুখি হয়েছে আপনার আগের মানুষেরাও। আর যদি এমনটাই চলতে থাকে, তাহলে একদিন হয়তো আমাদের প্রিয় এই পৃথিবী ধ্বংসের আগেই আরো কয়েক হাজারবার আমি, আপনি আর আমাদের বংশধরেরা পৃথিবী ধ্বংসের গল্প শুনে ফেলবে। 

এর আগে কবে কতবার এমন গুজব রটেছিলো, চলুন তা জেনে নেওয়া যাক!

প্রফেট হেনের ভবিষ্যদ্বাণী (১৮০৬)

যীশু ফিরে আসবেন এবং তিনি কী কী করবেন-এ নিয়ে অনেকেই অনেক ধারণা করেছেন। গল্প বানিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু লীডসের প্রফেট হেন ছিলেন সবার চাইতে আলাদা। ১৮০৬ সালে হুট করে উদিত হন তিনি সবার সামনে। মজার ব্যাপার হলো, এই হেন ছিলেন আসলে একটি মুরগী। যে কিনা যীশু আসছেন- এমন লেখা সম্বলিত ডিম পাড়ছিলো। সবার মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আর খুব বেশি বাকি নেই। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে, এটি পুরোটাই গুজব ছিলো।

উইলিয়াম মিলারের ভবিষ্যদ্বাণী (১৮৪৩)

ইংল্যান্ডের কৃষক উইলিয়াম মিলার কয়েক বছর পড়াশোনা করেন বাইবেল নিয়ে। আর শেষমেশ তিনি এই ফলাফলে আসেন যে, ১৮৪৩ সালের ২১শে মার্চ এবং ১৮৪৪ সালের ২১ মার্চ- এই দুই তারিখের কোন একটি দিনে পৃথিবী ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্রষ্টা। খুব দ্রুত তার অনেক অনুসারী তৈরি হয় এবং তারা ঠিক করেন যে, ১৮৪৩ সালের ২৩শে এপ্রিল এই ধ্বংস ঘটবে। মিলারের এই অনুসারীদের নাম হয় মিলেরিটস। মানুষ এতোটাই বেশি এই কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলো যে, নিজেদের সম্পত্তি অন্যদের দিয়ে দেয় তারা। তবে ২৩শে এপ্রিলে তেমন কিছু না ঘটলে মিলারকে অনুসরণ করা ছেড়ে দেয় সবাই। 

হ্যালির ধূমকেতু গুজব (১৯১০)

৭৫ বছর পরপর ফিরে আসে হ্যালির ধূমকেতু। মজার ব্যাপার হলো, ১৯১০ সালে এই ধূমকেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছিলো ভয়ংকর গুজব। সেসময় গুজব উঠেছিলো যে, হ্যালির ধূমকেতু এবার সবাইকে মেরে ফেলবে। সব জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। বাস্তবে তেমন কিছুই হয়নি। তবে মানুষের ভেতরে থাকা গুজবের আতঙ্কের ফলে সে বছর প্রচুর গ্যাস মাস্ক আর  অ্যান্টি-কমেট পিল বিক্রি হয়েছিলো। মে মাসে অবশ্য খুব শান্তভাবেই পৃথিবীর কাছ থেকে পার হয়ে যায় এই ধূমকেতু। ১৯৮৬ সালে তাকে আবার দেখা গিয়েছিলো। সব ঠিক থাকলে ২০৬১ সালে আবার উদীয়মান হবে হ্যালির ধূমকেতু। তখনও কি এমন কোন গুজব ছড়াবে? দেখাই যাক না!

হেভেন’স গেট ১৯৯৭

১৯৯৭ সালে হেল-বপ নামের একটি ধূমকেতু দেখা দেওয়ার কথা উঠলে ধীরে ধীরে মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করে যে, এই ধূমকেতুর পেছনে আসছে একটি এলিয়েন স্পেসশীপ। এই তত্ত্বটির জন্ম দেয় সান দিয়েগোর ইউএফও কাল্ট ‘হেভেন’স গেট’। তারা জানায় যে, এই ধূমকেতু এলেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশ্যই, শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি। তবে কাল্ট দলটি এই ব্যাপারটি নিয়ে আর বেশিদূর এগোয়নি। সেই বছরের ২৬শে মার্চ মৃত্যুবরণ করে দলটির মোট ৩৯ জন সদস্য।

চেন তাও-এর ভবিষ্যদ্বাণী (১৯৯৮)

আপনি হয়তো তার কথা শোনেননি। তবে তাইওয়ানের ধর্মীয় দল ‘চেন তাও’ এর প্রতিষ্ঠাতা এবং নেতা চেন হং-মিন ১৯৯৮ সালে দাবি করেছিলেন যে, স্রষ্টা সেই বছরের ৩১শে মার্চ একটি টেলিভিশন চ্যানেলে  দেখা দেবেন। নিজেকে নবী হিসেবে দাবী করেন তিনি। পৃথিবীর ধ্বংস নিয়েও কথা বলেন এই মানুষটি। এসময় স্পেসশীপে স্রষ্টা এসে মেঘের আড়াল থেকে ফুলের মালা দেবেন তাকে এবং তার অনুসারীদেরকে, এমনটাই বলেন তিনি। তবে তারও আগে স্রষ্টা এই কাজের ঘোষণাও দেবেন। কিন্তু এমন কিছুই শেষ পর্যন্ত হয়নি। পরবর্তীতে একটি সংবাদ সম্মেলনে নিজের দাবীকে প্রলাপ বলে ভাবতে সবাইকে জানান চেন হং-মিন।  

ওয়াইটুকে বাগ এবং মানব ইতিহাস ধ্বংসের ধারণা (২০০০)

২০০০ সালকে ঘিরে সবারই নানারকম ধারণা ছিলো। ঠিক তেমনই একটি ধারণার নাম হলো ওয়াইটুকে বাগ। এই বাগ তৈরী হওয়ার পর তৎকালীন প্রযুক্তির সাথে মাত্র পরিচিত হওয়া মানুষের মনে ধারণা জন্ম নেয় যে, কম্পিউটারে যেহেতু রাষ্ট্র, মানুষ এবং সবার সব তথ্য রয়েছে, এভাবেই যেহেতু মানুষ নিজেকে প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করছে, তাই এই বাগ কম্পিউটারে চলে আসলে এর মাধ্যমে মানব বসতিও ২০০০ সালের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এজন্য বিভিন্ন দোকানে এই বাগের প্রস্তুতি হিসেবে কখনো পচবে না এমন খাবার বিক্রি করা শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে মানুষ বুঝতে পারে যে, এই বাগ কম্পিউটারের উন্নতির মাধ্যমে ঠিক করে ফেলা সম্ভব। এই গুজবের ফলে কম্পিউটারে অনেক উন্নতি আসে।

লার্জ হ্যাড্রন কোলিন্ডার এবং ব্ল্যাক হোলের আশঙ্কা (২০০৮)

২০০০ সাল তো গেলো। প্রযুক্তিতে উন্নতি এলো আরো অনেক। তৈরী হলো পৃথিবীর অন্যতম বড় ও শক্তিশালী পার্টিকেল এক্সেলিরেটর- লার্জ হ্যাড্রন কোলিন্দার। ২০০৮ সালে এর উদ্বোধনের সময় গুজব ছড়ায় যে, এটি চালু হলেই পৃথিবিতে ফাটল দেখা দিবে এবং ব্ল্যাক হোলের জন্ম হবে। সেসময় এর নির্মাতারা নিশ্চিত করেন যে, যদি এমন কিছু হয় তাহলে সাথে সাথে এই প্রযুক্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে। বলাই বাহুল্য, এমন কিছুই ঘটেনি!

প্রিচার হ্যারল্ডের ‘জাজমেন্ট ডে’ (২০১১)

রেডিও এবং টেলিভিশন রিপোর্টার প্রিচার হ্যারল্ড হুট করেই নিজের রেডিওতে ঘোষণা দিয়ে বসেন যে, ২০১১ সালের ২১শে মে পৃথিবীর শেষ দিন হবে। এই খবর ছড়িয়ে দিতে ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেন তিনি। তিনি বারবার বলেন যে, এইদিন মাত্র তিনজন মানুষ জীবিত থাকবেন। পরবর্তীতে এমনটা না হলে নিজেদের এই ঘোষণাকে ‘অদৃশ্য জাজমেন্ট ডে’ বলে চালিয়ে দেন তারা। 

মায়ান ক্যালেন্ডারের শেষ দিন (২০১২)

মায়ান ক্যালেন্ডারের কথা শুনে ২০১২ সালে অনেকেই ভেবেছিলেন যে, পৃথিবী সে বছরই ধ্বংস হয়ে যাবে। এক জরিপে দেখা যায় যে, পৃথিবীর জনসংখ্যার মোট ১০% মানুষ এই কথাটি বিশ্বাস করেন এবং ১০% মানুষ এমন কিছু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছিলেন তখন। মূলত, ৫১২৫ বছর আগের মায়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে এমন ধারণা করা করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিলো যে, ফ্রান্সের বুগারাখ নামের একটি স্থানই এই দুর্যোগ থেকে ছাড় পাবে। ‘২০১২’ নামে একটা চলচ্চিত্রও নির্মাণ করা হয় এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে। বিজ্ঞানীরাও এ ব্যাপারে বেশ দ্বিধায় ভুগছিলেন। এমনটা পরে অবশ্য হয়নি। তবে অনেক বিজ্ঞানীই বলেছিলেন যে, মায়ান ক্যালেন্দার ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বর শেষ হয়নি। আর এমন কোন ভবিষ্যদ্বাণীও এটি করেনি।

গিজার পিরামিড এবং পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দিন (২০১৭)

ক্রিস্টিয়ান নিউমেরোলজিস্ট ডেভিড মেয়াডে ২০১৭ সালে জানান যে, গিজার পিরামিডের জ্যামিতিক পরিমাপের পর তিনি জানতে পেরেছেন যে, পৃথিবী ২০১৭ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর ধ্বংস হবে। এছারা তিনি ‘প্ল্যানেট এক্স-২০১৭’ এই নামে একটি বইও লেখেন। তার ত্বত্ত্ব অনুসারে, ২০১৭ সালের ওইদিনে লুকিয়ে থাকা একটি গ্রহ নিবিরু বা প্ল্যানেট এক্স পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষ ঘটাবে এবং পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। নাসা আগে থেকেই এই দাবীকে উড়িয়ে দেয়। আর নাসার ধারণাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়। সর্বশেষ শোনা যাচ্ছে যে, ২০৩২ সালে একটি গ্রহাণু আঘাত হানতে যাচ্ছে পৃথিবীতে। নাসার মতে, যেটি পৃথিবীকে অনেকটাই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। 

গুজব কি সবসময় গুজব? তাহলে কেন মানুষ গুজবে এতো কান দেয়? কারণ, আমরা বিশ্বাস করতে পছন্দ করি। আমরা যেকোন কথায় আগেপিছে খুব একটা না ভেবেই সেটাকে আকড়ে ধরি অনেকসময়। তবে কোনকিছুতে অন্ধ বিশ্বাস করবেন না।

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি