বখতিয়ার খিলজির জীবনী

বখতিয়ার খিলজির জীবনী

পাঠ্যবইয়ের পাতায় আমরা সবাই পড়েছি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নাম। তিনিই প্রথম মুসলিম যিনি বাংলা বিজয় করেন। কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে আমরা খুব কমই জানি! সামান্য একজন কুলি থেকে তিনি হয়েছিলেন একজন দিগবিজয়ী বীর!

বখতিয়ার খিলজির জীবনী :

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ছিলেন জাতিতে তুর্কি এবং বিখ্যাত খিলজি বংশের। বংশ পরম্পরায় এই খিলজি বংশের সামর্থ্যবান পুরুষেরা তুর্কি সেনাবাহিনীতে সৈন্য হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করতেন।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ছিলেন ইয়াতিম। ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়ে দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করেন। ভাগ্যান্বেষনে বের হয়ে তিনি আফগানিস্তানের গরমশিরে কুলীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, সাহসী, পরিশ্রমী ও উচ্চাভিলাষী। 
একবার অবিশ্বাস্য সাহসিকতায় তিনি একাই একটি পাগলা হাতিকে ঠেকিয়ে দিয়ে অনেকগুলো মানুষের জীবন বাচিঁয়েছিলেন! কুলীর কাজ করলেও রক্তে তাঁর আজন্ম সাধ হবেন বীর সেনা!

গজনীর সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরীর সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। আকারে খাটো, অস্বাভাবিক লম্বা হাত এবং বসন্তের দাগভরা কিছুটা কুৎসিত চেহারার অধিকারী হওয়ায় সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করতে ব্যর্থ হন। এছাড়াও তখনকার সময়ে সিপাহী হতে হলে নিজের ঘোড়া ও অস্ত্র থাকতে হতো, যা অতি দরিদ্র বখতিয়ার খিলজির ছিল না। 
গজনীতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ভারতের দিল্লিতে তৎকালীন শাসনকর্তা কুতুবউদ্দীন আইবেকের দরবারে হাজির হন। এখানেও তিনি সাধারণ সৈন্যের চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবর-উদ্দিন, বখতিয়ার খলজিকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকরি প্রদান করেন। কিন্তু উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার খিলজির সামান্য সৈন্য হয়ে সন্তুষ্ট থাকলেন না।

বখতিয়ার খিলজির জীবনী :

তিনি তাঁর মতো কিছু বেপরোয়া এবং অদম্য সাহসীদের বাছাই করে ছোটখাটো একটা দল করেন এবং তাঁদের নিয়ে অযোধ্যায় যান। অযোদ্ধার শাসনকর্তা হুসামউদ্দীন তাকে বর্তমান মীর্জাপুর জেলার পূর্ব দক্ষিণ কোণে ভগবৎ ও ভিউলি নামক দুইটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন। এখানেই বখতিয়ার তার ভবিষ্যৎ উন্নতির উৎস খুজে পান এবং এই দুটি পরগনাই পরবর্তীতে তার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।

সেই সময়ের হিন্দু রাজারা অনেক অত্যাচারী ছিলেন। তারা সুযোগ পেলেই মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্যগুলোতে আক্রমণ করতো এবং মুসলমানদের হত্যা সহ তাঁদের মালামাল লুণ্ঠন করতো। এদের শাস্তি দেয়ার জন্যে  ১২০১ সালে বখতিয়ার মাত্র দু হাজার সৈন্য নিয়ে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলো আক্রমন করেন এবং নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন।  সেই সময়ে তার বীরত্বের কথা চারিদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং অনেক ভাগ্যান্বেষী মুসলিম সৈনিক তার বাহিনীতে যোগদান করতে থাকে, এতে করে তার সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি একদিন এক প্রাচীরবেষ্টিত দূর্গের মত স্থানে আসেন এবং আক্রমন করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী আক্রমণ করেছেন জেনে প্রতিপক্ষ কোন বাধাই দেয় নি। দূর্গজয়ের পর তিনি দেখলেন যে দূর্গের অধিবাসীরা প্রত্তেকেই মুন্ডিতমস্তক এবং দূর্গটি বইপত্র দিয়ে ভরা। জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি জানতে পারলেন যে তিনি একটি বৌদ্ধ বিহার জয় করেছেন। এটি ছিল ওদন্দ বিহার বা ওদন্দপুরী বিহার। সেই সময় থেকেই জায়গাটি বিহার বা বিহার শরীফ নামে পরিচিত হয়।

বিহার জয়ের পর বখতিয়ার খলজী অনেক ধনরত্ন সহ দিল্লীর শাসনকর্তা কুতুব-উদ্দীন আইবকের সাথে দেখা করতে যান এবং কুতুব-উদ্দীন কর্তৃক সম্মানিত হয়ে ফিরে আসেন। এর পরই তিনি বাংলা জয়ের জন্য সাহস এবং শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন।
তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণ সেন বাংলার রাজধানী নদিয়ায় অবস্থান করছিলেন কারণ নদিয়া ছিল বহিঃশত্রুর কাছ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল।নদিয়ায় আসার কিছুদিন আগে লক্ষ্মণ সেন একটি অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নের কারন ব্যাখ্যায় রাজসভার পন্ডিত তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, বখতিয়ার খলজী তার রাজ্য আক্রমণ করতে পারে। 

দুর্ধর্ষ ও সাহসী জাতি ‘মাসাই’ দের কাহিনী

বখতিয়ার খিলজির জীবনী :

বখতিয়ার খিলজির নাম শুনেই লক্ষন সেনের মনে ভীতির সঞ্চার হয় কেননা ততদিনে বখতিয়ার খিলজির বীরত্ব চারদিকে ছড়িয়ে পরেছে। লক্ষ্মণ সেন নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন। লক্ষন সেনের ধারণা ছিল, ঝাড়খণ্ডের শ্বাপদসংকুল অরণ্য দিয়ে কোন সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদীয়া আক্রমন করা সম্ভব নয়; কিন্তু বখতিয়ার সেইপথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। 

নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার খলজী ধাড়খণ্ডের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এত দ্রুত অগ্রসর হয়েছিলেন যে, তার সাথে মাত্র ১৮ জন সৈনিকই তাল মেলাতে পেরেছিলেন। বখতিয়ার খলজী সোজা রাজা লক্ষন সেনের প্রাসাদদ্বারে এসে উপস্থিত হন এবং দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন। এতে প্রাসাদের ভিতরে হইচই পড়ে যায় এবং লক্ষণ সেন দিগ্বিদিগ জ্ঞান হারিয়ে, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কোন প্রকার পাল্টা প্রতিরোধ না করেই প্রাসাদের পেছনের দড়জা দিয়ে নৌপথে পালিয়ে বিক্রমপুরে চলে যান। 

বখতিয়ার খিলজির জীবনী :

বখতিয়ার খলজী নদিয়া জয় করে পরবর্তীতে লক্ষণাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। এই লক্ষণাবতীই পরবর্তীতে লখনৌতি নামে পরিচিত হয়। গৌড় জয়ের পর আরোও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তীতে বখতিয়ার খলজী বিশ্রাম না নিয়ে তিব্বত আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল তিব্বতে মুসলমান ঝাণ্ডা উড়লে পরবর্তীতে তুর্কিস্তান পর্যন্ত অধিগ্রহণ করা সম্ভব হবে। বখতিয়ার খলজী মাত্র দশ হাজার সৈন্য নিয়ে কয়েক লাখ সেনাবাহিনীর তিব্বতে আক্রমণ করেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশ (তীব্র ঠাণ্ডা) এবং পার্বত্য উপজাতিদের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি এবারে পরাজয় বরন করেন। 

পরাজয়ের গ্লানিতে বখতিয়ার খলজী অসুস্থ এবং পরে শয্যাশায়ী হন। এর অল্প কিছুদিন বাদে ১২০৬ খৃষ্টাব্দে তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় মৃত্যুবরন করেন। কেউ কেউ অনুমান করেন যে, বখতিয়ারের মৃত্যুতে তাঁর কোন ঘনিষ্ঠজনের হাত ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন চিরকুমার! আমৃত্যু তিনি মুসলমান সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের কাজে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। তরবারি লড়াইয়ে তাঁর সাথে টেক্কা দিতে পারে, সমসাময়িক সময়ে এমন কোন বীর ছিলেন না।

Check Also

কারিগর

আধুনিক ডিজেল ইঞ্জিনের কারিগর

আপনার অফিস বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, ছেলেমেয়ের স্কুলও হাতের নাগালে নেই। তার ওপরে আপনি …