বাবা-মায়ের আচরণ

বাবা-মায়ের আচরণ সন্তানের কর্মক্ষেত্রে কতটা প্রভাব রাখে? 

কর্মক্ষেত্রে অনেকসময় আপনি সবার চাইতে কাজে পিছিয়ে পড়ছেন? অনেক কারণ এর পেছনে থাকতে পারে। হয়তো আপনি কারো সাহায্য চান না, হয়তো আপনি সময় ঠিক করে বন্টন করতে পারছেন না। সম্প্রতি গবেষকেরা জানিয়েছেন যে, কর্মক্ষেত্রে আপনি কেমন এবং সহকর্মীদের সাথে আপনার আচরণ ঠিক কেমন সেটাকে প্রভাবিত করে আপনার বাবা-মায়ের আচরণ এবং সম্পর্কও। 

কোন সমস্যায় পড়লে আপনার বাবা-মা কি করতেন, তাদের মধ্যকার একে অন্যকে বোঝার ক্ষমতা কেমন ছিলো- এই সবকিছুই যেহেতু আপনি ছোটবেলা থেকে দেখেছেন, তাই এর একটি প্রভাব বড় হওয়ার পরেও আপনি না চাইতেও আপনার মধ্যে বিরাজ করে। আর সেখান থেকে চলে আসে কর্মক্ষেত্রে আপনি কেমন সেটার ব্যাখ্যা। 

অ্যাটাচমেন্ট থিওরি নামক এই তত্ত্বটি প্রথম দেন ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী জন বলবি। তিনিই বলেন যে, আমাদের বাবা-মায়ের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন সেটার উপরে নির্ভর করে যে, অন্যদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে। খুব সহজভাবে বলতে গেলে মানুষের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দুইরকমের অ্যাটাচমেন্ট বা সংশ্লিষ্টতা কাজ করে। একটি হলো- নিরাপত্তার সংশ্লিষ্টতা এবং অন্যটি হলো উদ্বিগ্নতার মাধ্যমে তৈরি হওয়া সংশ্লিষ্টতা। প্রথমটির মাধ্যমে একজন মানুষ অন্যদের সাথে মিশতে, অন্যকে ভালোবাসতে এবং বিশ্বাস করতে শেখে। দ্বিতীয় সংশ্লিষ্টতা হলো একদম এর বিপরীত। এর ফলে একজন মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করে। কারো উপরে সে ভরসা করতে পারে না। আর দ্বিতীয় এই সংশ্লিষ্টতা থেকেই চলে আসে এড়িয়ে চলার সংশ্লিষ্টতা। এটিও একরকমের সংশ্লিষ্টতা বা অ্যাটাচমেন্ট, যেটি একজন মানুষকে এটা শেখায় যে, তার অন্যদের থেকে দূরে থাকা উচিত। কোন মানুষের খুব কাছাকাছি চলে এলে এই মানুষগুলো সমস্যা বোধ করেন। 

আমাদের কারো মধ্যে কোন রকমের অ্যাটাচমেন্ট গড়ে উঠবে সেটার পেছনে যেমন বাবা-মায়ের অবদান রয়েছে, তেমনি আমাদের নিজেদেরও প্রভাব রয়েছে। জিন এক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। তবে পরিবেশকেও উপেক্ষা করা যায় না। আর একজন মানুষের প্রাথমিক পরিবেশ গড়ে ওঠে তার বাবা-মায়ের চারপাশেই।

শিশুদের জন্য কোন সমস্যাকে কীভাবে সমাধান করা যায় সেটার রোল মডেল তৈরি করেন তার বাবা-মা। সেটা ব্যক্তিগত সম্পর্কে হোক কিংবা কর্মেক্ষেত্রে- একজন মানুষ ছোটবেলা থেকে যেতা শেখেন সেটাকেই ব্যবহার করার চেষ্টা করেন বাস্তবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দ্বারা বাহ্যিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার এই প্রক্রিয়াটিকে অনেকটা আড়াল করে দেয় বংশগত সম্পর্ক। অর্থ্যাৎ, বাবা কিংবা মা যেমন ব্যবহারই করুন না কেন, একজন শিশু তো তাদের জিনই নিজের মধ্যে ধারণ করছে। ফলে যদি শিশু কোন নির্দিষ্ট আচরণ করে বড় হয়ে, সেটার কারণ হতে পারে তার ভেতরে চলে আসা সেই বাবা-মায়ের জিন। কথাটি সত্যি। তবে সম্প্রতি এই সমস্যাটির একটি সমাধান খুঁজে বের করেছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। মোট ১৫৭ জন দম্পতির উপরে একটি গবেষণা চালান তারা। এদের মধ্যে দেখা যায় যে, যেসব ব্যক্তির বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে তাদের মধ্যে ইনসিকিউর অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল বা অনিরাপত্তায় ভোগার ব্যাপারটি বেশি কাজ করে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের পারডু ইউনিভার্সিটি কালুমেটের গবেষকদের করা একটি গবেষণায় মোট ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, তাদের অনেকেই বাবা-মায়ের মধ্যে অনেক বেশি ঝগড়া এবং মারামারি দেখেছেন। আর সেই অভিজ্ঞতার কারণিএ তাদের মধ্যে সংশ্লিষ্টতার এড়িয়ে চলার ধাপটি প্রকাশ পেয়েছে। 

মজার ব্যাপার হলো, এতোদিন ধরে একজন শিশুর অ্যাটাচমেন্টের প্রভাব পরবর্তীতে বন্ধুদের সাথে বা ভালোবাসার সম্পর্কের উপরে কতটা পড়েছে সেটা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ফুটিয়ে তুলেছেন গবেষকেরা। এবার একেবারেই ভিন্ন একটি স্থানের উপরে এই অ্যাটাচমেন্টের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন তারা। আর সেটি হলো কর্মস্থল বা অফিস।

ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার ধরণ কর্মস্থলে কীভাবে প্রভাব রাখে?

নানাভাবেই একজন মানুষ ছোটবেলা থেকে কীভাবে বড় হয়েছেন, তিনি অন্যান্য মানুষের সাথে কতটা সংশ্লিষ্ট বোধ করেন সেতার প্রভাব তার কর্মস্থলে পড়ে। এই যেমন- আপনি যদি অনিরাপত্তায় ভুগে থাকেন সেক্ষেত্রে আপনি আপনার সহকর্মীর উপরে ভরসা করতে পারবেন না। তাকে বিশ্বাস করতে ভয় পাবেন। একই ব্যাপার ঘটতে পারে আপনার অফিসের সিনিয়র কর্মীর ক্ষেত্রেও। সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে কাজ করা এবং নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখাটাও কষ্টকর হয়ে পড়বে। 

সাধারণত, বাবা-মায়ের আচরণ এর উপর নির্ভর করে একজন মানুষের পরবর্তী জীবনের বেশ কিছু আচরণ তৈরি হয়। এই যেমন-

১। বাবা-মা যদি একে অন্যের সাথে সব বিষয়ে কথা বলেন এবং সামাজিক স্থানেও উপস্থিত থাকেন সেক্ষেত্রে আপনি পরবর্তী জীবনে নিজেকে অনেক বেশি বহির্মুখী হিসেবে খুঁজে পাবেন। এছাড়া আপনার চারপাশের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাটাও আপনার পক্ষে অনেক বেশি সহজ হবে।

২। বাবা-মা যদি ছোটবেলায় আপনাকে খুব একটা সময় না দিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে আপনি নিজেকে গুটিয়ে রাখার ক্ষেত্রেই বেশি আগ্রহী হবেন। তবে হ্যা, একইসাথে আপনার মধ্যে চারপাশের মানুষের কাজ থেকে মনযোগ পাওয়ার চাহিদা বেড়ে যাবে।

৩। আপনার বাবা-মা কি একে অন্যের কাছ থেকে অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতেন, বা বলতে চাইতেন না? সেক্ষেত্রে এমন একটা সম্পর্ক হয়তো আপনার জন্যও সামনে অপেক্ষা করছে। 

মজার ব্যাপার হলো, এগুলোর কোন একটি ব্যাপার হয়তো আপনি নিজের আপনার বাবা-মায়ের আচরণ এর মধ্যে থাকাকালীন সময়ে পছন্দ করেননি। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রভাবিত হওয়ায় ঠিক একই পরিস্থিতিতে আপনার মাথায়ও প্রথম সেই সমাধানটিই আসবে যেটি আপনার বাবা-মা নিজেদের বেলায় সমাধান হিসেবে বেছে নিতেন।

সংশ্লিষ্টতা কি স্থায়ী?

না। একজন মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হন। কিন্তু এর পুরোটাই নির্ভর করবে আপনি কোন পরিস্থিতিতে আছেন এবং নিজেকে এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কতটা তৈরি তার উপরে। তবে একজন মানুষ ধীরে ধীরে পরিবর্তনকে মানিয়ে নিতে পারেন। এজন্য দরকার আত্মোপলব্ধি। আপনি যদি অনিরাপত্তায় ভোগেন বা এড়িয়ে চলার মানসিকতা রাখেন, সেক্ষেত্রে একটি বিশ্বাস করা যায় এমন পরিবেশ আপনার মধ্যে সিকিউর অ্যাটাচমেন্টও তৈরি করতে পারে। 

আরোও পড়ুনঃ হোয়াকিন ফিনিক্সহোয়াকিন ফিনিক্স : অস্কারজয়ী এক নায়কের নেপথ্যের ইতিহাস

কিছু ব্যাপার আপনি না বুঝেই করেন। কিছু কাজ করেন শিখে নেওয়ার পর। তাই, ধীরে ধীরে শিখতে শুরু করলে একটা সময় আপনিও নিজের সহজাত স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে কাজ করতে পারবেন এবং সেটাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।

তবে গবেষকদের মতে, শিশুদের জন্য কোন নতুন কিছুকে আয়ত্ব করে নেওয়াটা সবচাইতে সহজ ব্যাপার। হ্যা, ছোটবেলায় কোন ভাষা শেখাতা খুব সহজ। অন্তত, বড় হওয়ার পরে নতুন ভাষা শেখার চাইতে ত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশিই সহজ বলা যায়। তবে শিশুকালের এই ব্যাপারগুলো বেশি সহজ হলেও বড় হওয়ার পর নতুন কিছু শেখা কিন্তু একেবারে অসম্ভব নয়। একটু হয়তো কঠিন মনে হতে পারে পুরো ব্যাপারটিকে আপনার প্রাথমিকভাবে। তবে চেষ্টা করতে থাকলে একটা সময় নিজের এই চিন্তার প্রক্রিয়াকে অনেকটাই সহজ করে তুলতে পারবেন আপনিও!

সূত্রঃ বিবিসি

Check Also

দুর্ধর্ষ ও সাহসী জাতি 'মাসাই'

দুর্ধর্ষ ও সাহসী জাতি ‘মাসাই’ দের কাহিনী

পৃথিবীতে যে কয়টি দুর্ধর্ষ ও সাহসী জাতি সম্বন্ধে জানা যায় এদের মধ্যে “মাসাই” অন্যতম। মাসাইদের …