মানচিত্রে নেই যে দেশের

মানচিত্রে নেই যে দেশের নাম!

মানচিত্রে নেই যে দেশের

মানচিত্রে নেই যে দেশের!!! স্বাধীনতা দিবসে কত আনন্দ করি আমরা। উৎসব আর আয়োজনে কেটে যায় আমাদের দিন। কেনই বা হবে না এমন! স্বাধীনতা অর্জন করা, এ কি কম বড় অর্জন? দিনিস্তার এবং ইউক্রেনের সীমান্তের ঠিক মাঝ বরাবর অবস্থিত রাষ্ট্র ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার ব্যাপারটাও ঠিক এমন। ১৯৯০ সালের ২রা সেপ্টেম্বর নিজেদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে তৎকালীন ট্রান্সনিস্ত্রিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ায় এমনটা হওয়ারই ছিলো। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে আনন্দের সাথে স্বাধীনতা দিবস পালন করে রাষ্ট্রটি। তবে তারপরেও, বাকি সব রাষ্ট্রের চাইতে খানিকটা আলাদাই বলা যায় ট্রান্সনিস্ত্রিয়াকে। কেন? কারণ, বাকিরা শুধু নিজেদেরকে স্বাধীন ঘোষণা করেনি। তাদেরকে স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে অন্যান্য দেশ এবং জাতিসংঘও। ট্রান্সনিস্ত্রিয়া নিজেই শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আর কেউ স্বীকৃতি না দেওয়ায় দেশটি পৃথিবীর মানচিত্রে এখনো পর্যন্ত কোথাও নেই!

কী অদ্ভূত, তাই না? তবে অবাক করার মতো হলেও ব্যাপারটি সত্যি। ট্রান্সনিস্ত্রিয়াকে পৃথিবীর একমাত্র দেশ বলা হয় সেটি মানচিত্রে নেই। ৪০০ কিলোমিটারের এই ছোট্ট স্থানটির আগের নাম ছিলো প্রিনেস্তোভিয়ান মলদোভিয়ান রিপাবলিক বা পিএমআর। বর্তমানে দেশটির রাজধানী অবস্থিত তিরাসপলে। দেশ হিসেবে স্বীকৃত না হলে কী হবে, এর জনসংখ্যা খুব একটা কম নয়। পুরো ৪৬৯,০০০ জন!   

ছোট্ট এই ভূখণ্ডটিকে অনেকসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে আটকে থাকা একটি স্থান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। সৈন্যবাহিনীর কুচকাওয়াজ বা স্বাধীনতার ঘোষণা- কোনটাই এই দেশটির অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন এনে দিতে পারেনি। ১৯৮২ সালে সারভাইভার ব্যান্ডের ‘আই অব দ্য টাইগার’ গানটি প্রথম জানান দেয় যে, মলডোভার সাথে যুক্ত এবং রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও এই দেশটি একটু আলাদা। ব্যাপারটি নিয়ে ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার জনগন অবশ্য খুব একটা খুশি নয়। “নিজেদের সংবিধান, সামরিক বাহিনী, সরকার, মুদ্রা এবং পাসপোর্ট থাকার পরেও আমরা স্বাধীন দেশ নই, এই ব্যাপারটি খুব কষ্টকর”। নিজেদের অবস্থা নিয়ে কথাগুলো জানান দেশটির সরকারি খাতে একজন নাগরিক ভেরা গ্লানচেনকো।

মানচিত্রে নেই যে দেশের নাম!!!

তবে পাসপোর্ট থাকলেও তাতে যে দেশটির খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। ট্রান্সনিস্ত্রিয়াকে স্বীকৃতি দিয়েছে মোট তিনটি দেশ- আবখাজিয়া, নাগোর্নো-কারাবাখ এবং দক্ষিণ ওজেটিয়া। আর এদের কোনটার সাথেই সরাসরি কোন যোগাযোগের মাধ্যম না থাকায় ছোট্ট এই দেশটির নাগরিকদের পাসপোর্ট শুধু শোভা বাড়ানোর কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার বেশিরভাগ জনগনই একের অধিক দেশের নাগরিক। মলদোভা, ইউক্রেইন এবং রাশিয়া- বেশিরভাগ জনগনের নাগরিকত্বই এই তিনটি দেশকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। তাই, বাস্তবে তারা কোন দেশহীন মানুষ নন। তাদেরও পরিচয় আছে, অবস্থান আছে। কিন্তু এই মানুষগুলো নিজেদেরকে ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার নাগরিক বলতেই বেশি পছন্দ করেন। 

৩০ বছর আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবে তিরাসপল থেকে অনেক মানুষ রাশিয়ায় দিকে ছুটে যায়। ফলে হুট করেই দেশটির নাগরিক কমে যায়। তবে, কাজের নিরাপত্তা অন্যসব স্থানেও খুব বেশি ছিলো না। বরং, বর্তমানে ট্রান্সনিস্ত্রিতে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা আশপাশের সবগুলো দেশের চাইতে তুলনামূলকভাবে ভালো বলা যায়। নাগরিকরাও তাদের বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট। 

“আমাদের এখানে ভালো আবহাওয়া, স্থানীয় ফল আর শস্য এবং বাইরের সাহায্য রয়েছে”। ট্রান্সনিস্ত্রিয়া পর্যটনের প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্দ্রে স্মোলেন্সকি বলেন কথাগুলো। ২০১১ সালেই নিজের এই প্রতিষ্ঠান চালু করেন তিনি। বাইরের সাহায্য বলতে অবশ্য এখানে অ্যান্দ্রে রাশিয়ার কথা বুঝিয়েছেন। ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার হাসপাতাল, ভাতা- এই সবগুলোর জন্যই দেশটি এখনো রাশিয়ার মুখাপেক্ষী। যদিও এখানে আপনি তিন রকমের এথনিক গোষ্ঠী খুঁজে পাবেন, তবে তাদের মূল ভাষা মূলত রাশিয়ান। এমনকি ট্রান্সনিস্ত্রিয়ান পতাকার মধ্যেও আপনি রাশিয়ান পতাকার ছোয়া খুঁজে পাবেন। রাশিয়া নিজেদের এই ছোট্ট দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়নি বটে, তবে দেশটির স্বাধীনতা দিবসে ট্রান্সনিস্ত্রিয়ান সৈন্যদের সাথে রাখিয়ান সৈন্যরাও প্যারেড করে। আর সেখানে এক লাঠিতে একইসাথে রাশিয়ান এবং ট্রান্সনিস্ত্রিয়ান পতাকা আটকানো থাকে। 

কেন নিজেকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করেন রাশিয়ার দিকে এমনভাবে মুখাপেক্ষী হয়ে আছে ট্রান্সনিস্ত্রিয়া? এ ব্যাপারে শিক্ষক অ্যান্তোলি দিরুন বলেন- “ট্রান্সনিস্ত্রিয়া ঐতিহাসিকভাবে সবসময় নিজেকে রাশিয়ার সংস্কৃতির একটি অংশ বলে মনে করেছে। আর এই ব্যাপারটিও অস্বীকার করা যাবে না যে, রাশিয়াই নিজের পার্শ্ববর্তী এই ছোট্ট দেশটির শান্তি নিশ্চিত করে আসছে বছরের পর বছর ধরে”। 

যেকোন সমস্যায় রাশিয়ার পাশে যেমন ট্রান্সনিস্ত্রিয়া দাঁড়ায়, তেমনি ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার পাশেও সবসময় থাকে রাশিয়া। রাশিয়ার অপারেশনাল গ্রুপ অব রাশিয়ান ফোর্সে শান্তি বজায় রাখার জন্য উবদান রাখছে ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার সৈন্যরাও। দেশ হিসেবে নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও যেখান থেকে নিজের জন্ম হয়েছে তার সাথে বিবাদে জড়াতে চায়নি ট্রান্সনিস্ত্রিয়া। বরং রাশিয়াকে সবসময় নিজের বন্ধু হিসেবেই ভেবেছে এবং রাশিয়াও বন্ধুর মতোই দেশটির পাশে থেকেছে।

মানচিত্রে নেই যে দেশের নাম!!!

ট্রান্সনিস্ত্রিয়াকে নিজের স্বাধীনতার জন্য এতোদিন কেন অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তাদের এই যাত্রাটা কেন এতো কঠিন হয়েছে সেটা আলাদাভাবে বলার কোন দরকার পড়ে না। কিন্তু তারা কেন নিজেদের স্বাধীনতা দাবী করলো? ১৯৮০ সালে, তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার মোট ১৫টি দেশ নিজের মতো করে আলাদা রাষ্ট্র গড়ে তোলে। সেসময় প্রবল জাতীয়তাবাদ আরো অনেকের মতো রাশিয়ান ভাষায় কথা বলা ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার এথনিক গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। যার সর্বশেষ অগ্রগতি ছিলো রাশিয়ান ভাষাকে নিষিদ্ধ করা। আর তখনই নিজেদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য ২রা সেপ্টেম্বর, ১৯৯০ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করে স্বাধীন প্রিনেস্তোভিয়ান মলদোভিয়ান রিপাবলিক-এর মাধ্যমে। 

সেসময় অবশ্য ইউএসএসআর এই ব্যাপারতীর প্রতিবাদ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেদের তখন একত্রিত রাখতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। সেজন্য ইউএসএসআরের তৎকালীন নেতা মিখাইল গর্বাচেভ পিএমএসএসআরকে বাতিল বলে ঘোষনা করেন। ফলে ১৯৯১ সালে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে ট্রান্সনিস্ত্রিয়া একেবারে আলাদা একটি দেশ হিসেবে জন্ম নেয়। এই ব্যাপারটি নিয়ে সমস্যা আরো অনেকদূর গড়ায়। ফলে এই দুটি ভূখন্ডের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ তৈরি হয় ১৯৯২ সালে। একটা সময় শান্তিচুক্তিও হয়। তবে তার আগেই যুদ্ধে ১,০০০ জনের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। আর তারপর থেকেই এখন পর্যন্ত ট্রান্সনিস্ত্রিয়া একটি শুধুই শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে। 

সেসব অস্থির দিন এখন দেশটির জন্য অতীত। নানারকম সমস্যা এসেছে এরপরেও। তবে নিজেকে কখনোই আর কোন যুদ্ধের মধ্যে নিয়ে যায়নি ট্রান্সনিস্ত্রিয়া। বরং, রাশিয়ার সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। রাজনৈতিক কোন ব্যাপারেও বর্তমানে তারা একজন আরেকজনের বন্ধু হিসেবেই সাহায্য করছে। 

আরোও পড়ুনঃ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ১০ টি দেশের কথা

অক্টোবরে দেশটির মধ্য থেকে সৈন্য চলে যাওয়ার সাথে সাথে ট্রান্সনিস্ত্রিয়া অনেকগুলো এথনিক গোষ্ঠীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। লোক সঙ্গীত আর নানারকম প্যারেডের মধ্যে দিয়ে যে স্বাধীনতার শুরু হয়েছিল সেবার, এখন সেখানে বেড়াতে গেলে দেশের সবখানে নানারকম কমিউনিস্ট চিহ্নের সাথে সাথে সংস্কৃতির ছোঁয়া খুঁজে পাবেন আপনি। যুদ্ধ করার জন্য যেসব মিলিটারি ট্যাংক আর যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিলো, সেগুলোকে রঙ আর কথা দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে দেশটি। রেখে দিয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। দেশটিকে আপনি স্যান্ডউইচ স্টেট তকমাটা সহজেই দিতে পারেন। তবে মানচিত্রে না থাকলেও নিজের গুরুত্ব আর অবস্থানকে সবসময় শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরেছে ট্রান্সনিস্ত্রিয়া। মলদোভা ট্রান্সনিস্ত্রিয়াকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছে, আবার রাশিয়া সেটা করতে নারাজ। সব মিলিয়ে বেশ একটা ঝুলন্ত অবস্থা হয়েছে দেশটির। তবে পুরোপুরি স্বাধীনতা না পেলেও নানারকম উপায়ে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিতে ভুলছেন ট্রান্সনিস্ত্রিয়াও।

ট্রান্সনিস্ত্রিয়াতে খুব বেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো দালানকোঠা নেই। তবে এখানে ঘুরতে মলদোভা থেকে প্রতি বছরে প্রায় ২০,০০০ পর্যটক আসেন। অবশ্য, বাড়তি ভিসা ছাড়া আরেকটা দেশ ঘুরে ফেলার সুযোগ থাকলে সেটাকে কেই-বা হাতছাড়া করতে চাইবে! কী ভাবছেন? মানচিত্রহীন এই দেশে একবার ঘুরে আসা যাক তাহলে!

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …