মিসাইল

মিসাইল: মারণঘাতি এক সমরাস্ত্র

মিসাইল বা ক্ষেপনাস্ত্র হোলো পৃথিবীর আধুনিকতম সমরাস্ত্রগুলোর একটি যা পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে গত কয়েক বছরে বিরাট কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে ৷ প্রায় প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসা ক্ষেপনাস্ত্র হামলা সম্পর্কিত সংবাদ বিশ্ববাসীকে যুদ্ধ ভয়ে কাবু করে রাখে ৷ সাধারণত নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিশানা অনুযায়ী চলে আঘাত করতে পারা স্বয়ংক্রিয় বা গাইডেড গোলাবারুদকেই মিসাইল বলা হয় ৷ ল্যাটিন “মিট” শব্দ, যার বাংলা অর্থ “কিছু পাঠানো’ থেকেই মিসাইল শব্দটি এসেছে ৷ 

মূলত রকেট সিস্টেমেরই আধুনিক সংস্করণ প্রযুক্তি এই সমরাস্ত্র৷ চায়নিজদের আবিষ্কৃত রকেট প্রযুক্তিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমসাময়িক সময়ে নাৎসীদের দ্বারা এবং তার পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাধর দেশগুলোর দ্বারা মিসাইল নামক ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ৷ রকেট প্রযুক্তির সাহায্যে দূরবর্তী নির্দিষ্ট স্থানে উপকারি বা অপকারী যে কোন কিছু নিক্ষিপ্ত করবার চর্চা থেকে যেহেতু স্বয়ংক্রিয় নির্ভূল নিক্ষেপনকারী প্রযুক্তির আবিষ্কার হয়েছে, তাই এক প্রকার রকেটই বলা যায় ৷ কিন্তু এটি তার কাজ করবার ধরনের জন্য স্বতন্ত্র ৷ রকেটের সাহায্যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা অনেক সময় ব্যর্থ হলেও মিসাইলে এমন কোন সম্ভাবনা একেবারেই নেই ৷ এটি রকেটের চেয়ে তীব্র গতিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে ৷ আধুনিক মিসাইলগুলো পারমানবিক বোমা পর্যন্ত নিক্ষেপ করবার ক্ষমতা রাখে বিধায় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে, ক্ষমতাধর দেশগুলির ক্ষমতাপ্রকাশের অন্যতম বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই প্রযুক্তি ৷

অ্যারোডায়নামিক্সের সূত্রে পরিচালিত একেকটি মিসাইল মূলত উন্নত ইঞ্জিনসমৃদ্ধ হয়ে থাকে ৷ ইঞ্জিন সলিড ফুয়েলের সাহায্যে কাজ করে ৷ পদার্থবিজ্ঞানের পরাবৃত্তের জটিল সূত্রে এর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারিত হয় ৷ তবে দিন দিন লেজার বা হিট সিকিং ডিভাইস, জিপিএসের মত উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে আরো নিঁখুতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে বিধ্বংসী ভাবে আঘাত হানতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র ৷ এর ওয়ারহেড অংশটিই মূলত আঘাত করে লক্ষ্যবস্তুকে ৷ আগে ওয়ারহেড অংশে গোলাবারুদ ঠাঁসা থাকলেও বর্তমানে এটির ওয়ারহেডে বিষাক্ত নানা রাসায়নিক থেকে শুরু করে পারমানবিক বোমা পর্যন্ত রেখে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা যায় ৷

মিসাইল মূলত দুই প্রকার ৷ ক্রুজ এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে তুলনামূলক কম শক্তিশালী সিস্টেম হল ক্রুজ মিসাইল সিস্টেম ৷ জেট ইঞ্জিন দ্বারা চালিত এই মিসাইল ২০০০ কিলোমিটারের ভেতর যেকোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে ৷ দেড় টনের মত ওজনের এইসব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে মহাশূন্যে যেতে হয়না ৷ বিমানের সাহায্যে একটা মোটামুটি উচ্চতা থেকে এগুলো নিক্ষেপ করা যায়। তবে কিছু কিছু ক্রুজ মিসাইলের ওয়ারহেডে পারমানবিক বোমা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায় ৷ ঐ মিসাইলগুলো সাধারনত ভয়াবহ বিপদজনক হয় ৷ ক্রুজ মিসাইল দুই ধরনের হতে পারে ৷ এক ধরনের ক্রুজ মিসাইল ভূমিতে রাখা যে কোন টার্গেটে আঘাত হানতে পারে ৷ টার্গেট চলন্ত হলেও তারা আঘাত হানতে সক্ষম ৷ এই ধরনের ক্রুজ মিসাইলকে “ল্যান্ড এটাক ক্রুজ” বলা হয় ৷ একেকটি ল্যান্ড এটাক ক্রুজ কিনতে খরচ পড়ে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার ৷ আরেক ধরনের ক্রুজ হচ্ছে, যেগুলো জাহাজ ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়। তাদেরকে এন্টি শিপ মিসাইল বলা হয় ৷ তবে, এইগুলো উপকূলবর্তী টার্গেটেও আঘাত হানতে পারে ৷

এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে ব্যালেস্টিক মিসাইল ৷ এগুলো উন্নত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি অনুসারে পরিচালিত হয় ৷  এইগুলো এতই বিপদজনক যে, কোন প্রতিরক্ষা সিস্টেম দিয়েই একে আটকানো যায় না ৷ মহাশূন্য থেকে নিক্ষেপিত এই মিসাইলগুলো টার্গেটকে কত উচ্চতা থেকে আঘাত করতে পারে, তার উপর ভিত্তি করে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে ৷ শর্ট রেঞ্জগুলো এক হাজার কিলোমিটার, মিড রেঞ্জগুলো দুই থেকে চার হাজার এবং ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জেরগুলো প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটারের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে ৷ তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক, শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী হল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল ৷ একটি মহাদেশ পর্যন্ত ধ্বংস করে ফেলতে পারে বলে এইসব মিসাইলকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল বলা হয়ে থাকে ৷ এইগুলো পাঁচ হাজার কিলোমিটারেরও দূরের লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে পারে ৷ পারমানবিক শক্তিধর প্রতিটি দেশই এখন এই ধরনের মিসাইল প্রস্তুতে মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছে ৷

আরোও পড়ুনঃ মনুষ্যবিহীন ভয়ংকর আকাশযান বা যুদ্ধড্রোন

মিসাইল প্রযুক্তিতে বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ও যুক্তরাজ্য। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চীন,জার্মানী, ইরান ও ভারতের মত দেশগুলোও প্রতিদিন নতুন নতুন বিধ্বংসী সংস্করন নিয়ে গবেষনা করে যাচ্ছে ৷

আমাদের পাঠকদের জন্য ধারাবাহিক আয়োজনের পরবর্তী সংখ্যায় থাকছে মিসাইল ধারক পৃথিবীর শীর্ষ দেশগুলোর শক্তি সমন্ধে বিস্তারিত আলোচনা ৷ 

Check Also

কিলার ড্রোন

চীনেই প্রথম কিলার ড্রোন !

কেমন হয় যদি বলি আপনার হাতে একটি রিমোট দেবো এবং আপনি শুয়ে বসে জলভাগ দাপিয়ে …