রহস্যে ঘেরা “হ্যাকিং” জগৎ

রহস্যে ঘেরা “হ্যাকিং” জগৎ

হ্যাকিং  শব্দটা শুনলেই  আমাদের মনে  একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। হ্যাকিং শব্দটির সাথে আমরা কমবেশি অনেকেই পরিচিত। বিশেষ করে তরুণ  প্রজন্মের কাছে এ এক অন্য রকম রোমাঞ্চের নাম।আসলে হ্যাকিং হচ্ছে কারো কম্পিউটারে বা কম্পিউটারের নেটওয়ার্কে অবৈধ অনুপ্রবেশ। আমরা হ্যাকিং বলতে বুঝি ওয়েবসাইট হ্যাকিং। কিন্তু না হ্যাকিং শুধু ওয়েবসাইট হ্যাকিং এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হ্যাকিং হতে পারে কারো পার্সোনাল কম্পিউটার, ওয়েব সার্ভার, মোবাইল ফোন, ল্যান্ড ফোন, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক, ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস আরো অনেক কিছু। কিন্তু সব সময় যে হ্যাকিং মানে অবৈধ অনুপ্রবেশ ই বুঝায় তা না।মাঝে মাঝে হ্যাকিং বৈধ কাজেও ব্যবহার করা হয়।হ্যাকিং যারা করেন তাদের কে “হ্যাকার” বলা হয়। তারা যা হ্যাক করে তার সম্পর্কে তারা খুব ভাল জ্ঞান রাখে। সকল তথ্য আগে থেকেই জেনে রাখে তারা।

হ্যাকার দের কথা শুনলে অনেকের মনেই যে ধারণা টা জন্মে তা হল যে কোন অসাধু লোক কারো প্রয়োজনীয় বা  ব্যক্তিগত জিনিস চুরি করেছে। কিন্তু এটা আসলে ভূল ধারণা। কারণ সব হ্যাকাররা অসাধু কাজে হ্যাক করেনা। কিছু কিছু হ্যাকার তার দেশ এবং দেশের জনগণের জন্য এই কাজগুলো করে থাকেন জনগণের উপকারের জন্য।

ষাটের দশকে এমআইটি ইঞ্জিনিয়াররা প্রথম হ্যাকিং শব্দটির প্রচলন করেন। এর সূত্রপাত হয় মেইন ফ্রেম কম্পিউটার এর কোডিং ভাঙ্গার মাধ্যমে মজা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার পরেই কিছু নীতিহীন হ্যাকার অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে মোবাইল ফোন হ্যাক শুরু করে। কম্পিউটার এর প্রচলন তেমন না থাকায় তখন হ্যাকাররা মোবাইল ফোন হ্যাক করত। যাদেরকে বলা হত “Phreaker”।

বিভিন্ন ধরনের হ্যাকার আছে-

হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার: হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার যারা তারা ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে। যেমন- কোন সিস্টেমের ভূল ত্রুটিগুলো বের করে তারা সেই সিকিউরিটি সিস্টেমের মালিককে তা সম্পর্কে অবহিত করে থাকে। যার ফলে সেই সিস্টেমটি ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায়। সেটা হতে পারে কোন কম্পিউটার অথবা ওয়েবসাইট অথবা কোন সফটওয়্যার। 

গ্রে হ্যাট হ্যাকারএই হ্যাকাররা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেনা। বলা যেতে পারে অনেকটা শখের বশেই হ্যাক করে থাকে তারা। যে কোন সিকিউরিটি সিস্টেমের ত্রুটিগুলো বের করে তারা ইচ্ছা করলে মালিক কে জানাতে পারে বা নিজের স্বার্থে ব্যবহার ও করতে পারে। বেশিরভাগ হ্যাকার রাই এমন হয়ে থাকে।

 ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারএই হ্যাকাররা হচ্ছে পৃথিবীর সব চেয়ে ভয়ানক হ্যাকার। এদের উদ্দেশ্য থাকে অন্যায় কাজে বা নিজেদের স্বার্থের জন্য কোন সিস্টেম হ্যাক করা বা সিস্টেম নষ্ট করা। সিস্টেমে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে পুরো একটি সিস্টেম ধ্বংস করতে এরা পারদর্শী। তারা যখন কোন সিস্টেম হ্যাক করে তা শুধু সাময়িক সময়ের জন্যই করেনা। এরা এতটাই পারদর্শীতার সাথে কাজটি করে যাতে ওই ভবিষ্যতেও তারা ওই সিস্টেমে যেন আবার ঢুকতে পারে। তাদের কাজকে চুরি বলাই যায়। তারা বিভিন্ন সিস্টেমের তথ্য চুরি করে নানান অপরাধ সংঘটিত করে থাকে।

হ্যাকাররা প্রচুর মেধাবী হয়ে থাকে। যে যত বড় হ্যাকার তার মেধা তত বেশি। সে তত বড় এবং জটিল সিস্টেম হ্যাক করতে সক্ষম হবে। বিভিন্ন ভাবে হ্যাকার রা হ্যাকিং করে থাকে। 

ড্যানিয়েল অব সার্ভিস এটাক : একে সংক্ষেপে ডিওএস এটাক ও বলা হয়। এর

মাধ্যমে হ্যাকাররা কোন একসেস না পেয়েও নেটওয়ার্কে ঢুকে ক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে।

ট্রোজান হর্সেসট্রোজান হর্সেস একটি ভাইরাস যা অন্যান্য প্রোগ্রামকে নষ্ট করে দেয়।

এটি পাসওয়ার্ড ও তথ্য হ্যাকার দের কাছে সয়ংক্রিয়ভাবে পৌছে দেয়।

ব্যাক ডোরসকোন সিস্টেমের ব্যাক ডোরস খুঁজে হ্যাকাররা সিস্টেমকে কাজ লাগায়। সহজ পাসওয়ার্ড, প্রশাসনিক সহজ রাস্তা, ভূল কনফিগারেশন ইত্যাদি কম্পিউটারের সাহায্যে খুঁজে বের করে।

রগ এক্সেস পয়েন্টসএটি ওয়ারলেস নেটওয়ার্কে প্রবেশের ক্ষেত্রে হ্যাকাররা ব্যবহার করে থাকে।

কেউ যদি চায় তবে সে হ্যাকিং এর মাধ্যমেই ক্যারিয়ার গড়তে পারে।তবে সেটা অবশ্যই ভালো উদ্দেশ্যে হতে হবে। হোয়াইট হ্যাট হ্যাকিং ভালো উদ্দেশ্যেই করা হয়।এর মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। বর্তমানে হোয়াইট হ্যাকারদের চাহিদা অনেক। আইটি বা কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করলে এই বিষয়টি অনেকটা সহজ হয়ে যায়। অবশ্য আইটি ছাড়াও অন্য কোন বিষয় থেকে পড়াশুনা করলেও সম্ভব হ্যাকিং নিয়ে ক্যারিয়ার গড়া। তাদের জন্য রয়েছে ফ্রিলান্স ইথিক্যাল হ্যাকার হিসেবে কাজ করার সুযোগ। এর মাধ্যমেও বহু টাকা আয় করা যায়। তবে অবশ্যই কম্পিউটিং সিকিউরিটি, নেটওয়ার্কিং এ ভাল জ্ঞান থাকতে হবে।

হ্যাকিং একদিকে যেমন ভালো কাজে ব্যবহার হচ্ছে অন্যদিকে তেমনি সর্বনাশ করছে সমাজের। তাই নিজের নিরাপত্তা নিজেরই রাখা দরকার। হ্যাকারদের হাত থেকে বাঁচার কিছু পথ রয়েছে। যেমন,

আমরা সবাই কমবেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে সেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো যেন কঠোর হয়। নিজেদের পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে দেয়া যাবেনা। যার যার একাউন্ট থেকে কাজ শেষ হলে লগআউট করে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কোন ওয়েব লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে। হুট করে কোন অ্যাপ,  গেমস বা ভিডিওর লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকা উচিত। নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা, নিজের একাউন্টে অতিরিক্ত আরেকটি ই-মেইল যোগ করা এবং ই-মেইলে কোন ধরনের স্পাম মেইলে ক্লিক না করা, কোন  অপরিচিত মেইলের এটাচমেন্ট না ক্লিক করা ইত্যাদি নিয়মগুলো সঠিক ভাবে মেনে চললেই আর আমাদের হ্যাকার দের ফাঁদে পড়তে হবেনা।

পরিশেষে বলতে চাই, হ্যাকিং এর ভালো এবং খারাপ দুই দিকই আছে। এটা সম্পূর্ণই নির্ভর করে আমাদের নিজেদের মন- মানসিকতার উপর। যদি ভালো কাজে লাগাই তবে দেশ, সমাজের উন্নতি হবে আর যদি খারাপ কাজে লাগাই তবে পুরো পৃথিবীটাও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই আসুন “হ্যাকিং” কে খারাপ উদ্দেশ্যে কাজে না লাগিয়ে ভাল উদ্দেশ্যে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।
লেখকঃ সাবরিনা ইবতেশাম তৃষা

Check Also

অ্যালিসা কারসন

অ্যালিসা কারসনঃ ২০৩৩ সালে মঙ্গল গ্রহে চলে যাবেন যে নারী!

কেমন হতো, যদি আপনাকে জানানো হতো যে, আপনি আর কখনোই আপনার পরিবারকে দেখতে পাবেন না? …