বিষণ্ণতা
বিষণ্ণতা

রোগের নাম বিষণ্ণতা

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক মানসিক ব্যাধিগুলোর একটি৷ সারা বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ এই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত৷ ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি ২০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষের ভেতর অন্তত ১ জনের বিষণ্ণতা আছে৷ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছে৷ সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল পুরুষের চেয়ে নারীরাই বিষণ্ণতার শিকার সবচেয়ে বেশি ৷

বিষণ্ণতা বলতে অনেকেই সাময়িক মন খারাপ থেকে হওয়া উদ্ভট আচরনের বহিঃপ্রকাশকেই বুঝে থাকেন৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা একেবারেই তেমন নয়৷ বিষণ্ণতা এক দীর্ঘ মানসিক সমস্যা যা আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি একটি রাষ্ট্রেরও আর্থ সামাজিক অবস্থানে নানাভাবে প্রভাব ফেলতে পারে৷ একজন বিষন্ন ব্যক্তি সবকিছুতে হতাশ হয়ে যখন সবকিছুর প্রতি অনীহা বোধ করতে শুরু করেন তখন তিনি আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারেন৷ সারা বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে, যাদের বেশিরভাগই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত৷

এখনো অনেকেই বিষণ্ণতা যে একটি রোগ তা বুঝতে পারেন না বা বুঝতে পেরেও নানা কারনে এড়িয়ে যেতে চান৷ এটি করা মোটেও উচিত নয়৷ বিষণ্ণতা রোগটি কি, এটি হওয়ার কারন, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকারগুলো নিয়ে আজ থাকছে বিস্তারিত আলোচনা৷

বিষণ্ণতা কি : 

অনেকেই বিষণ্ণতাবোধ এবং দুঃখবোধকে এক করে ফেলেন৷  আমাদের স্বাভাবিক জীবনে দুঃখবোধ হওয়া অন্যান্য মৌলিক আবেগগুলোর মতই স্বাভাবিকতার বহিঃপ্রকাশ৷ কিন্তু বিষণ্ণতা দুঃখবোধের তুলনায় অনেক আলাদা জিনিস৷ বিষণ্ণতার সংজ্ঞায় বলা হয়, দুঃখবোধের মতন আবেগ যখন টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোন ব্যক্তিকে ঘিরে রাখে এবং এর ফলে সেই ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন যাপন, কর্মতৎপরতা ও পারস্পারিক সম্পর্কগুলো বাধাগ্রস্থ হয় তখন তাকে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা বলা যায়৷ যে কোন ধরনের যে কোন বয়সী মানুষ এই মানসিক সমস্যাটির কবলে পড়তে পারেন৷ ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা একটু স্বাভাবিক মাত্রায় দেখা গেলেও শিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক মাত্রায় আক্রান্ত করছে ৷ লক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন মাত্রার বিষণ্ণতা দেখা যায়৷ বিষণ্ণতা যে মাত্রারই হোক এর বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে৷

বিষণ্ণতার কারন: 

বিষণ্ণতা এমন এক ধরনের জটিল অসুখ যে, এর সুস্পষ্ট কারণ চিহ্নিত করে বলা যায় না। তবে একজন ব্যক্তি নানা কারনে বিষণ্ণতার ভেতর দিয়ে যেতে পারেন৷ 

যেমন:

১) অপমানবোধ: শারীরিক ও মানসিকভাবে তীব্র কোন অপমানবোধের ভেতর দীর্ঘ সময় থাকলে কোন ব্যক্তি বিষণ্ণতার কবলে পড়তে পারেন৷

২) নিরাপত্তাহীনতা: রাষ্ট্রীয়, সামাজিক কিংবা পারিবারিক জায়গা থেকে কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করবার ফলে আস্তে আস্তে বিষন্ন হয়ে যেতে পারেন বলে গবেষকরা বলেছেন৷

৩) একাকীত্ব: কোন ব্যক্তি যদি সঙ্গী শূন্যতায় থাকেন, এবং তার এই একাকীত্ব যদি তাকে ক্রমশঃ দূর্বল করে তুলে তবে তিনি মানসিকভাবে অনেক জটিল অবস্থার মুখোমুখি হন৷ একাকীত্বের কারনে উদ্ভূত সেই জটিল মানসিক পরিস্থিতি কারো কারো বিষণ্ণতার কারন৷ সবচেয়ে কাছের মানুষের মৃত্যশোকও অনেক সময় বিষণ্ণতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে৷

৪) বংশগত প্রভাব: পরিবারের কারো বিষণ্ণতার সমস্যা থাকলে পরিবারের বাকীদের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন৷

৫) জীবনযাপনে বড় কোন ধাক্কা: অনেক সময়ই দেখা যায় হঠাৎ কোন ঘটনা জীবনের স্বাভাবিক চলন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে৷ জীবন পদ্ধতিতে আচমকা এই বড় ধরনের পরিবর্তন আসলে মানুষ সহজেই তার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনা৷ ফলে সে বিষন্ন হয়ে যেতে পারে৷

৬) বড় কোন রোগের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া: বড় কোন রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে মানুষের সাময়িক দুঃখবোধ অনেক সময় গভীর বিষণ্ণতার কারন হয়৷ 

৭) ঔষধের প্রভাব: অনেক সময়ই দেখা যায় নির্দিষ্ট ঔষধ ব্যবহারী মানুষ জন বিষন্ন হন তুলনামূলক বেশি৷ আইসোট্রেটিনিয়ন বা ইন্টারফেরন আলফাজাত অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ বেশিরভাগ সময়ই বিষণ্ণতার কারন হতে পারে৷

৮) মাদকের প্রভাব: নেশা উদ্রেককারী বিভিন্ন দ্রব্যাদির ক্রম ব্যবহার মানুষের স্বাভাবিক আত্মপ্রত্যয় ও কর্মোদ্দীপনাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে৷ এই অবস্থা বেশিরভাগ সময়ই বিষণ্ণতার কারন হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে৷

বিষণ্ণতার লক্ষণ: 

বিষণ্ণতার বিভিন্ন মাত্রা আছে৷ মাত্রা অনুযায়ী এর বেশিরভাগ লক্ষণ দেখা যায়৷ কিন্তু বিষণ্ণতার কিছু লক্ষণ আছে যা মাত্রাভেদে সব বিষন্ন মানুষের ক্ষেত্রে বলতে গেলে একই৷

বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো নিম্নরূপ: 

১। কাজের প্রতি অনীহা চলে আসা: সব বিষন্ন মানুষেরই কাজের প্রতি ধীরে ধীরে অনীহার সৃষ্টি হয়৷ যে কাজগুলো আগে মানুষটি খুব উৎফুল্ল ও আনন্দের সাথে করতেন, বিষন্ন হবার পর সে কাজটি নিয়ে মনের সকল আগ্রহই হারিয়ে ফেলেন তিনি৷ বিষণ্ণতার সমস্যায় যারা ভুগেন তারা বাস্তবতাকে মেনে নেবার ক্ষমতা একটু একটু করে হারিয়ে ফেলেন এবং একটা সময়ে ঘর থেকে বের হওয়াটাকেই একটা সমস্যার মত ভাবতে শুরু করেন৷ ফলে একজন বিষন্ন মানুষ ক্রমশঃই একজন ঘরকুনো হিসেবে পরিচিত পান৷

২। খাদ্যাভ্যাসে আকষ্মিক পরিবর্তন: বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে আকষ্মিক খাদ্যাভ্যাসে বিরাট বড় পরিবর্তন দেখা যায়৷ অনেক সময়ই দেখা যায় কেউ হয়তো তার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম মাত্রায় খাদ্য গ্রহন করছেন৷ এতে হয় খুব দ্রুতই শরীরের ওজন বেড়ে যায় অথবা আশংকাজনক হারে খুব দ্রুত ওজন কমতে থাকে৷ ফলে খাদ্য সংক্রান্ত নানা রোগের উপসর্গ দেখা যায়৷

৩। অনিদ্রা রোগ : অনিদ্রা বিষণ্ণতার অন্যতম বড় একটি লক্ষণ৷ এক গবেষণায় জানা গেছে পৃথিবী জুড়ে শতকরা ৮৫ ভাগ অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত মানুষই বিষন্ন৷ 

৪। অবসাদ: বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলেই মানুষ খুব দ্রুত অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে৷ সে সবকিছু থেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে এবং ভেতর থেকে জটিল ধরনের ক্লান্তি অনুভব করে৷

৫। অমনোযোগীতা: একজন বিষন্ন মানুষকে যখন সবকিছু থেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন তখন প্রায়শই দেখা যায় কোন নির্দিষ্ট কাজ থেকে বারবার তার মনোযোগ সরে যাচ্ছে৷ অমনোযোগীতা বিষণ্ণতার লক্ষণ হিসেবে বেশ জটিল ও মারাত্মক৷

৬। নেতিবাচক মনোভাব: একজন বিষন্ন লোককে তার মনোভাব দেখে সহজেই আঁচ করা যায়৷ একজন বিষণ্ণতার রোগী সকল বিষয়ে সাধারনত নেতিবাচক ধারনা পোষন করেন৷ বিষণ্ণতা আমাদের স্বাভাবিক আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়চেতা মনোভাবের প্রবল ক্ষতিসাধন করে৷ ফলে বিষন্ন লোককে সবসময় মনমরা দেখা যায়৷

বিষণ্ণতার প্রতিকার:

বিষণ্ণতা সমন্ধে আগেই বলা হয়েছে এর বিভিন্ন মাত্রা আছে৷ মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসাও আছে৷ তাই মানসিক দূরাবস্থার সম্মুখীন হলেই উচিত মনোবিদের সাথে আলোচনা করা৷ এ ছাড়াও আরো কিছু উপায়ে সহজেই বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়৷ 

নিয়মমাফিক জীবন: বিষণ্ণতা নির্মূলে নিয়ম মাফিক জীবন চালনার কোন বিকল্প নেই৷ পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম অনেকখানি সহযোগীতা করতে পারে এই ক্ষেত্রে৷

লক্ষ্য ভিত্তিক কাজ করা: বিষন্ন একজন মানুষের স্বাভাবিক কাজের প্রতি অনীহার সৃষ্টি হয়৷ ফলে তিনি যদি প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করেন তবে তার জন্য কাজের অভ্যাস পুনরায় ফিরে পাওয়া তুলনামূলক সহজতর হয়৷ ব্যস্ততা অনেকক্ষেত্রেই বিষণ্ণতা নির্মূলের কারণ৷ বিষণ্ণতা অনেক সময় একঘেঁয়েমি তৈরি করে৷ কাজ করার লক্ষ্য যদি থাকে, তবে কাজের মধ্য দিয়ে আনন্দ পেতে হবে। তবে মানুষ সহজেই বিরক্তি কাটাতে পারে ও কাজ করে শান্তিতে থাকতে পারে৷

পর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ ও ঘুমের অভ্যাস: সুষম খাদ্যাভ্যাস একজন মানুষের বিষণ্ণতা কাটানোর প্রধান অস্ত্র হতে পারে৷ গবেষণায় জানা যায় ফলিক এসিড এবং ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড থাকা খাদ্যগুলো গ্রহণ করলে বিষণ্ণতা কেটে যায়৷ তবে শুধু খাদ্য গ্রহণই না, এর জন্য থাকা চাই পর্যাপ্ত ঘুমেরও অভ্যাস৷ ঘুম বিষণ্ণতা কমায়৷ একজন মানুষের রোজ কমপক্ষে ৬ ঘন্টা ভালমত ঘুমানো উচিত৷

ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাস: ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাস বাস্তবতার ধকল সামলাতে সহায়তা করে৷ এতে করে দুঃখবোধের মাত্রা কমে৷ দুঃখবোধের মাত্রা কমে গেলে বিষন্ন হওয়ার সম্ভাব ৭০ শতাংশের মত কমে যায়৷ তাই মনোবিদেরা সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করবার পরামর্শ দেন৷

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণরা বিষণ্ণতার শিকার সবচেয়ে বেশি৷ এই ক্ষেত্রে তাদের ডিভাইস আসক্তি, অসুস্থ প্রতিযোগীতা সম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা ও নগরায়নকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা৷ এই জটিল মানসিক রোগটিকে কোনভাবেই খাটো করে দেখবার অবকাশ নেই৷

Check Also

ধর্ষণ, নিপীড়ন – কোন দেশে কত জন?

ধর্ষণ পৃথিবীর গর্হিত অপরাধগুলোর একটি। একেক দেশে এটির শাস্তি বিধান একেক রকম। অনেক দেশেই ধর্ষণকে …