সাবান এলো কীভাবে?
সাবান এলো কীভাবে?

সাবান এলো কীভাবে?

গোসল করতে গেলে সাবান না হলে হয় নাকি! একটা সময় কিন্তু সাবান ছিলো না। তো, তখন কীভাবে মানুষ গোসল করতো? কোথা থেকে সাবান নামের একটি পদার্থ তৈরীর চিন্তাটা মানুষের মাথায় আসলো? সাবান নিয়ে যাদের মনে এতো প্রশ্ন, তাদের জন্যই আজ লেখা হলো সাবানের ইতিহাস!

শুরুটা কীভাবে?

সাবান তৈরি নিয়ে রয়েছে অনেক রুপকথা। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো- স্যাপো হিলের গল্প। রোমের স্যাপো হিলের নিচ দিয়ে নদী বয়ে যেতো। আর সেই নদীতে কাপড় ধুয়ে দিচ্ছিলেন সেখানকার নারীরা। নদীতে তখন শুধু কাপড়ই ধোয়া হতো না। একইসাথে নদীর পাশে পশুবলিও দেওয়া হতো। বরাবরের মতো সেখানে পশুবলি দিচ্ছিলো কিছু মানুষ। এমন সময় পশুর চর্বি মাটির সাথে একত্রে পানিতে মিশে যায় এবং পিচ্ছিল একটি পদার্থ তৈরি করে। কাপড় ধুতে থাকা নারীরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, কাপড় ধোয়াটা বেশ সহজ হয়ে যাচ্ছে এই পিচ্ছিল পদার্থটার  কারণে। ব্যস! সেখান থেকেই গল্প শুরু হয় সাবানের।

তবে এটা শুধুই গল্প বলে মনে করেন অনেকে। সাবান প্রথম তৈরির কৃতিত্ব অনেকে ব্যাবিলনবাসীকে দিতে চান। অবশ্য এই তথ্যের প্রমাণও রয়েছে। সেসময় পিচ্ছিল সাবানের পাত্রও রাখতো ব্যাবিলনের বাসিন্দারা। সেই পাত্রের ভেতরে থাকা পদার্থের যে গুণাবলীগুলো লেখা রয়েছে সেগুলোর সাথে আজকের সাবানের গুণাবলী অনেকটা মিলে যায়। চর্বির সাথে কাঠপোড়ার গুড়ো ধরণের একটি পদার্থ মিশিয়ে পানিতে দ্রবীভূত করতেন তারা। উলের কাপড় এবং সুতির কাপড় ধুতে এই পদার্থ ব্যবহার করতেন করা হোতো। তবে তখনো শরীর পরিষ্কারের জন্য সাবান ব্যবহার করতেন না তারা। 

তবে রোম বা ব্যবিলন একা নয়। সাবান তৈরি করেছিলেন মিশরীয়রাও। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৫০ সালে প্রাণীজ এবং উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করে বিশেষ এক ধরণের লবন মিশ্রণের মাধ্যমে তারা সাবান তৈরি করেন। কাপড় ধোয়ার পাশাপাশি ত্বকের নানারকম সমস্যার সমাধানেও এই সাবান ব্যবহার করেন তারা। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ শতকে ফোয়েনিশিয়ানরা ছাগলের চর্বি এবং কাঠকয়লা দিয়ে সাবান বানানো শুরু করে। 

প্রাচীন গ্রীকবাসীরা ক্ষার এবং কয়লার মাধ্যমে বাসন ও দেবতার মূর্তি পরিষ্কারক বানানো শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রোমানরা অবশ্য একটু ভিন্নভাবে পরীক্ষা করা শুরু করে ব্যাপারটি। সাবান তৈরীর জন্য মুত্র ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। সেই সাথে ক্ষার এবং কাঠকয়লা এই দুই উপাদান ব্যবহার করা হয় শক্ত এবং নরম দুই ধরণের সাবান তৈরির জন্য। পম্পেই-এ খুব পুরনো এক সাবানের কারখানা খুঁজে পাওয়া যায়। রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বড় এই সাবানের কারখানা ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মাউন্ট ভিসুভিয়াসের লাভা উদ্গীরণের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। 

যদিও গোসল করতে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য রোমান সাম্রাজ্য বেশ জনপ্রিয় ছিলো, তবে প্রথমদিকে রোমে সাবান ব্যবহার করা হতো চিকিৎসা কাজে। পরবর্তী শতকে এসে রোমে গোসলের সময় গায়ে মাখার প্রথা হিসেবে সংযুক্ত হয় সাবান। কেল্টসরা কাঠকয়লা এবং প্রাণীদেহের চর্বি দিয়ে যে সাবান তৈরি করতেন, সেটার নাম দেন স্যাইপো। আর সেখান থেকেই আজকের ‘সোপ’ নামটি এসেছে বলে মনে করা হয়।

জার্মানরা চর্বির মাধ্যমে সাবান বানাতো বটে, তবে সেই সাবান তারা ব্যবহার করতো চুলকে সাজাতে। আরবরা অবশ্য একটু অন্যরকমভাবে সাবান তৈরি করে। উদ্ভিজ্জ তেলের মধ্য থেকে অলিভ অয়েল এবং অন্যান্য সুগন্ধী তেল ব্যবহার করে তারা সুগন্ধী সাবান বানিয়ে নেয়। এরাবিয়ানরাই প্রথম রঙিন এবং সুগন্ধী সাবান তৈরি করে। তাদের সাবান তরল এবং কঠিন দুইভাবেই ছিলো। 

১২০০ খ্রিষ্ঠাব্দে ফ্রান্স, স্যাভোনা এবং ইতালির মতো স্থানে সাবান চলে আসে। একটা সময় একই স্থানগুলো সাবান নির্মাণের জন্য বিখ্যাত হয়ে যায়। ১৬ শতকে ইউরোপের দেশগুলো প্রাণীজ তেলের বদলে উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ছোট আকৃতির হলে এসময় সাবান বানানোকে কেন্দ্র করে ব্যবসা পদ্ধতি শুরু হয়। 

ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে নিজেকে পরিষ্কার রাখা, রোগ থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং এক্ষেত্রে সাবানের ভূমিকা নিয়েও কথা শুরু হয়। ফলে, সাবান ব্যবহারের পরিমাণ ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।

সাবানের ইতিহাসঃ ডিটারজেন্ট কীভাবে এলো?

এ তো গেলো সাবানের কথা। সাবানের কথা বলতে গেলেই যে নামটি মনে পড়ে সেটি হলো ডিটারজেন্ট। এতোক্ষণ সাবান কীভাবে এলো, প্রথম কখন ব্যবহার করা হয়েছিলো সে ব্যাপারে লেখা হয়েছে।  কিন্তু আজকের যে সাবান এবং ডিটারজেন্ট সেটা কীভাবে এলো তা নিয়েই জানবো এবার। 

শুরুর দিকে সাবান ছিলো কিছু মানুষের দক্ষতার জায়গা। সাবান বানানোর মানুষ বেশি না থাকায় এবং এর মূল উপাদান প্রাণীজ ফ্যাট, উদ্ভিজ্জ ফ্যাট এবং কাঠকয়লা হওয়ায় এটি তৈরি করা ছিলো খুব কঠিন। ধীরে ধীরে এই সমস্যা কমে আসে। সাবান বানানোর প্রক্রিয়া সবাই জানতে শুরু করে, এতে সহজ উপাদান ব্যবহার করা শুরু হয় এবং মানুষ ধীরে ধীরে কম খরচে সাবান বানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলে। 

বিশেষ করে ১৭৯১ সালে ফ্রান্সে লেব্লাঙ্ক নামক একজন এমন একটি রাসায়নিক উপাদান আবিষ্কার করেন যেটি ব্যবহার করে খুব সহজেই কম খরচে সাবান বানানো সম্ভব হচ্ছিলো।  এই ঘটনারও প্রায় ২০ বছর পর ফ্রান্সের আরেক নাগরিক গ্লিসারিন, ফ্যাট এবং এসিডের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। তারপর থেকেই বর্তমান সময়ে আমরা যে সাবান ব্যবহার করছি সেটার শুরু হয়। সব মিলিয়ে ১৮০০ শতকের দিকে এসে সামানের দাম একেবারে কমে যায়। তবে তখন অব্দি কাপড় ধোয়া এবং গোসল করা- দুই ক্ষেত্রেই একই সাবান ব্যবহার করা হতো। ১৯ শতকের মাঝামাঝি এসে কাপড় ধোয়ার সাবান এবং গায়ে মাখার সাবানকে আলাদা করা হয়। ১৯৭০ সালে এসে তরল সাবান আবিষ্কার করা হয়। একইসাথে ছিলো রবার্ট স্পেয়ার হাডসনের তৈরী গুড়ো সাবানও। 

বর্তমানে আমরা সাবানের যে ব্যবসায়িক দিকটি দেখতে পাই, সাবান নিজের এই কমার্শিয়াল দিকটি ধারণ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। গ্রেট ওয়ারের পর, ১৯৩০ সালের আগ পর্যন্ত কেতলিতে গরম পানি বসিয়ে সেখান থেকে সাবান তৈরী করা হতো। পরবর্তীতে এই পদ্ধতিকে কমার্শিয়াল এবং দ্রুত করে তোলা হয়। ফলে সাবান উৎপন্নও হতে শুরু করে অনেক দ্রুত।

ইংরেজরা সাবান বানানো শুরু করে ১২ শতক থেকে। ১৬৩৩ সালে প্রথম চার্লস ওয়েস্টমিনিস্টারের সাবান প্রস্তুতকারক সমাজকে ১৪ বছরের সময় দেন। রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় এই সাবান শিল্প আরো বিস্তৃতি লাভ করে। রানী নিজেই বারবার সাবান দিয়ে গোসল করতেন। 

প্রথমে সাবানের উপরে কর আরপ করা হয়। তবে ১৮৫৩ সালে সাবানের উপরে এই বাধানিষেধ দূর করে দেওয়া হয়।

কালো সাবানঃ কীভাবে এলো?

সাবান যে নানারকম রঙয়ের হয় সেটা তো আরবদের মাধ্যমেই আমরা সবাই জানতে পেরেছি। তবে একইসময়ে আফ্রিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকায় কালো সাবান তৈরি করা শুরু হয়। অ্যানাগো সোপ, এলাটা সিমেনা- এমন অনেকগুলো নাম রয়েছে এই সাবানের। মূলত, আফ্রিকার নিজস্ব গাছের কয়লা থেকেই এই সাবান তৈরি করা হয়। গাছের কয়লা ব্যবহার করায় এর রঙ কালো হয়।

বিশেষ করে ঘানায় যেখানে এই সাবান তৈরি করা হয়, সেটির উপাদানের তালিকা বংশ পরম্পরায় সেখানো হয়। এই কালো সাবানেরও অনেকগুলো ভাগ রয়েছে। এই সাবান বানানোর রেসিপি অনেকটিই গোপন রাখা হয়। তাই স্থানভেদে এর রঙ এবং উপকরণও ভিন্ন হয়।

সাবান দেখে এবং ব্যবহার করে আপনি অভ্যস্ত। তবে একটা সময় এটি মোটেও অভ্যস্ততা ছিলো না। ছিলো বিলাসিতা। সামান্য এক টুকরো সাবানের পেছনে এতো এতো বছরের গল্প! ভাবতে অবাক লাগে, তাই না?

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …