হতাশার শহর!

 কোন কারণে খুব হতাশ লাগছে? এই হতাশা তো শুধু আপনার। একজন মাত্র মানুষের। ভাবুন তো, পুরো একটা শহর যদি হতাশায় ডুবে যেতো তাহলে কেমন হতো? বাস্তবেই পৃথিবীর একটি শহর নিজেকে হতাশ হিসেবে মেনে নিয়েছে। আর এই শহরটির নাম পুয়োলঙ্কা। ফিনল্যান্ডের এই ছোট্ট শহরটি নানারকম কারণেই পত্রিকার খবর হয়েছিলো। এইসব খবরের হাত থেকে রেহাই পেতে নিজেদেরকে হতাশ হিসেবেই মেনে নিয়েছে পুয়োলঙ্কার বাসিন্দারা। এমনকি, শহরের ভেতরে ‘পুয়োলঙ্কা পেসিমিস্ট অ্যাসোসিয়েশন বা পুয়োলঙ্কা হতাশাবাদী সংঘ’কেও খুঁজে পাবেন আপনি! চলুন, হতাশ এই শহরকে নিয়ে আজ জেনে নেওয়া যাক। তবে সবথেকে আশ্চর্য বিষয়টি জানেন? ফিনল্যান্ড কিন্তু বিশ্বের সবথেকে সুখী দেশ। তারই মধ্যে একটি হতাশার শহর রয়েছে, ব্যপারটা বেশ গোলমেলে লাগছে, তাইনা?

সতর্কবাণী!!!

পুয়োলঙ্কায় প্রবেশ করতে গেলেই বিশাল এক হলুদ সাইনবোর্ড চোখে পড়বে আপনার। আপনাকে স্বাগতম জানাচ্ছে শহরটি? উঁহু! হতাশ শহর কাউহে স্বাগতম জানায় না, চলে যেতে বলে। পুয়োলঙ্কাও সাইনবোর্ডে লিখে রেখেছে- “এখনো তোলার হাতে সময় আছে। সামনে পুয়োলঙ্কা। তাই আগে থেকেই ফিরে যাও।’ পুয়োলঙ্কা পেসিমিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ৪১ বছর বয়সী টমি রাজালা জানান যে, অনেকেই প্রতিদিন এই সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলার কথা ভাবে। কিন্তু তারপরেও, এটা তো পুয়োলঙ্কারই পরিচয়। হতাশাকে কীভাবে উপভোগ করতে হয় তা পুয়োলঙ্কার চাইতে ভালো কেউ জানে না। হতাশাকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এই শহরটিতে পেসিমিজম ফেস্টিভাল, পেসিমিজম মিউজিকাল এবং নানারকম দোকানও রয়েছে। আর এই সবখানেই হতাশাকে মজার এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন শহরের বাসিন্দারা।

হতাশ শহরের মেয়র

অন্যান্য শহরের মতো পুয়োলঙ্কাতেও রয়েছে মেয়র। আর নিজের শহর নিয়ে বেশ গর্ব অনুভব করেন মেয়র হারি পেলটোলা। শহরের বাইরে যেখানেই নিজের শহরের নাম বলেন তিনি, সবখানেই পুয়োলঙ্কার সাথে ‘হতাশা’ শব্দটি জুড়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, ছোট্ট এই শহরটি হতাশ হয়ে গেলো কেন হঠাৎ?

হতাশার শুরু যেখানে

হতাশ শহর হিসেবে পুয়োলঙ্কা যাত্রা শুরু করে এর জনসংখ্যা নিয়ে পত্রিকার নেতিবাচক সব খবরের পর। সেসময় পুয়োলঙ্কার জনসংখ্যা কমে আসছিলী একটু একটু করে। আর সেটা নিয়ে খবরের পাতায় নানারকম কথা ছাপা হচ্ছিলো। 

অবশ্য একা পুয়োলঙ্কা নয়, উন্নত দেশগুলোর একটি হিসেবে গোটা ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যায় কমে যাচ্ছে। দেশটির বেশিরভাগ জনগন এখন বয়স্ক। সর্বশেষ সমীক্ষা অনুসারে, ২০৩১ সালের ভেতরে ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যা কমে যাবে অনেকখানি। আর দেশটির যেসব শহরে এই প্রভাবটি সবচাইতে বেশি দেখা গিয়েছে তাদের মধ্যে সবচাইতে বাজে অবস্থা পুয়োলঙ্কার। শহরটির মোট বাসিন্দা এখন ২,৬০০ জন। আর এদের মধ্যে মট ৩৭% মানুষের বয়স ৬৪ বছরের এবশি। পুয়োলঙ্কার জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছিলো ১৯৮০ সালেই। বিশেষ করে বড় শহরের টানে এখান থেকে অনেক তরুণ চলে যাচ্ছে পুয়োলঙ্কা ছেড়ে। এতে করে আরো বেশি করে জনসংখ্যা হারাচ্ছে পুয়োলঙ্কা। ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শহরটির জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

ফিনল্যান্ডের একজন বিশেষজ্ঞ তিমো আরোর মতে, জনসংখ্যার পরিবর্তন দেশের কোন স্থানকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে, কোন শহরকে ইতিবাচকভাবে। পুয়োলঙ্কা হেরে যাওয়া সেই শহরগুলোর ভেতরে একটি যার উপরে জনসংখ্যার পরিবর্তন সবচাইতে নেতিবাচকভাবে পড়েছে। ২০০০ সালের দিকেই পুয়োলঙ্কাকে ঘিরে নানারকম মন খারাপ করা এবং নেতিবাচক খবর আসা শুরু করে গণমাধ্যমে। ব্যাপারটি এতো বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় যে, পুয়োলঙ্কার বাসিন্দারা ঠিক করে মানুষকে আর সুযোগ না দিয়ে নিজেদেরকেই সবচাইতে হতাশা শহর হিসেবে, সবচাইতে বাজে অবস্থায় পড়া শহর হিসেবে ঘোষণা করবে তারা। 

কী আছে পুয়োলঙ্কায়?

সত্যিই অনেক একা শহর পুয়োলঙ্কা। শহরটির সবচাইতে কাছের বড় শহর উলুও প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে মোট ছয়বার বাস আসে এই শহরটিতে। শহরে বেশ কয়েকটি মুদি দোকান, ফার্মেসি, একটি গ্যাস স্টেশন রয়েছে। সাথে আছে একটি রেস্টুরেন্ট। এই স্থানগুলোতে স্থানীয়রা জড় হয়ে গল্প করে, আড্ডা দেয়, দুপুরের খাবার সারে। সময় কাটায়। তবে সবমিলিয়ে পুয়োলঙ্কা শহরটি বেশিরভাগ সময়েই এবশ চুপচাপ থাকে। নানারকম কাজে ব্যস্ত থাকেন এখানকার বাসিন্দারা। এই যেমন- ৬৩ বছর বয়স্ক জাক্কো পাভোলা টাউন হলের পাশেই একটি বইয়ের দোকান চালান। তিনিও ২০০০ সালে গণমাধ্যমের হতাশাবাদী লেখনীতে বিরক্ত হয়ে এই উদ্যোগে যোগ দেন। গরমের ক্লান্ত বিকেলে তিনি নিজের দোকানে ‘পেসিমিজম ইভনিং’ উদযাপন করেন। এসময় দোকানে যারাই আসে তাদের প্রবেশ করতে কোন টাকা না লাগলেও দোকান ছেড়ে যাওয়ার সময় টাকা ভরতে হয়। একই কাজটি চলে টাউন হলেও। সেখানে এই হতাশ বিকেলে মানুষ শহরের সবাইকে দেখার জন্য, গল্প করার জন্য চলে আসে। ৬০ বছর বয়সী রিটা নাইকায়েনও এই দলে রয়েছেন। রিটার মতে, এই উদ্যোগ খুব প্রাকৃতিকভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। রিটা জানান, একজন মানুষ বলেছিলেন যে, পুয়োলঙ্কায় কোনকিছুই কাজ করে না। এমনকি হতাশাও না। সেখান থেকে একরকমের তেজ অনুভ করেন রিটা নিজের ভেতরে। শহরটির পেসিমিস্ট গ্রুপের তৈরি নানারকম অনুষ্ঠান শুধু শহরে নয়, পুরো ফিনল্যান্ড জুড়ে চলে। ধীরে ধীরে শহরের প্রত্যেকেই এই দলে যোগ দেয়। রিটা সেবিকা হিসেবে কাজ করতেন আগে। তবে এই উদ্যোগে যোগ দিয়ে নার্স হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি অনলাইন ভিডিও বানানোতেও সাহায্য করেন। তার নিজের একটি গানের দলও রয়েছে। আর এই দলটির নাম ‘ট্রমা গ্রুপ’। পুয়োলঙ্কার একমাত্র পেসিমিস্ট ব্যান্ড এটি। 

হতাশা যখন থেমে গেলো

প্রায় এক যুগ ধরে হতাশা নিয়ে এমন উদ্যোগের পর ২০১৬ সালে এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত অনেকেই সরে পড়েন। বিশেষ করে একদম শুরু থেকে যারা ছিলেন তারা চলে যান। এর পেছনে কারন হিসেবে ছিলো, কাজ করতে চায় এমন মানুষের অভাব। তবে খুব দ্রুতই রাজালাকে মেয়র হিসেবে শহরে নির্বাচিত করা হয়। রাজালা প্রায় দুই যুগ ধরে পুয়োলঙ্কার বাইরে ছিলেন। শহরে এসে প্রশাসনের তরফ থেকে তাকে হতাশা ছড়ানোর কাজ দেওয়া হয়। বলা হয়, হতাশা নামের ব্র্যান্ডকে পুয়োলঙ্কায় যেন জোরদার করা হয়। 

রাজালা প্রাথমিকভাবে একটি ভিডিও তৈরি করেন। যেখানে তিনি পুয়োলঙ্কার চারপাশে হেটে বেড়াচ্ছেন। অবশ্যই এটি তার কাজেরই একটি অংশ ছিলো। পুরো ভিডিওতে ডার্ক হিউমর ছিলো অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিও ২০০,০০ বার দেখা হয়। রাজালার দ্বিতীয় ভিডিওটিও প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ দেখে। রাজালার মতে, যেকোন কিছুর বিজ্ঞাপন করার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোন পণ্য যা না তা দেখানো। আরেকটু ভালোভাবে দেখানো। এদিক দিয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, হতাশা নিয়ে আমাকে বাড়তি কিছু বলতে বা করতে হচ্ছে না। 

প্রশাসনের সাথে কাজ করা বন্ধ করেছেন রাজালা অনেকগুলো দিন। তবে পেসিমিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের পার্ট-টাইম কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তিনি এখনো। এই রেজিস্টার্ড নন প্রফিট অর্গানাইজেশনে স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। অনলাইন শপ এবং কিছু ইভেন্টের মাধ্যমে, সাথে দাতাদের কাছ থেকে যে অর্থ আসে সেখান থেকেই এই সংঘটি পরিচালনা করা হয়।

সবচাইতে মজার ব্যাপার হলো, পুয়োলঙ্কার বাসিন্দাদের মধ্যে নারিদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু তারপরেও এখানকার ২০-২৯ বছর বয়সী পুরুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায়, তাদের সমবয়সী নারী খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। মজা করে বলা হয় যে, পুয়োলঙ্কায় ছেলে সন্তানেরা একজন নারীকেই দেখতে পায়। আর সেটি হলো তাদের মা। 

হতাশা নিয়ে শহরটি অনেকদিন ধরেই সামনে এগিয়ে চলেছে। হতাশাকেই ব্র্যান্ড বানিয়ে নিয়েছে। বাসিন্দারা আশা করে যে, খুব দ্রুতই তাদের এই হতাশ শহর পৃথিবীর সবার কাছে পরিচিত হবে। তবে একইসাথে মনে মনে পুয়োলঙ্কার অনেক বাসিন্দা অপেক্ষা করছেন অ্যান্টি-আরবানাইজেশনের জন্য। তাদের মতে, সেইদিন আর বেশি দূরে নেই যেদিন বড় শহর থেকে দলে দলে সবাই পুয়োলঙ্কায় ফিরে আসবে। কিন্তু আদৌ কি তা হবে? দেখাই যাক না!

লেখকঃ সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …