হারুকি মুরাকামির সাক্ষাতকার

জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির সাক্ষাতকার

জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি উত্তরাধুনিক সাহিত্যের একজন কিংবদন্তী। জীবনমুখী ও মনস্তত্ব নির্ভর সাহিত্যের ভেতর দিয়ে মুরাকামির দৃপ্ত পথচলা। পৃথিবীর অগনিত সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের দিনের পর দিন, মুরাকামি তাঁর সাহিত্যে বুঁদ করে রেখেছে ৷ তাঁর বই মাসে এক মিলিয়ন কপি বিক্রি হয় ৷ তাঁর ” কিলিং কমেন্ডেটর” উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর লন্ডনভিত্তিক বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ এ তাঁর একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করা হয়। এই সাক্ষাতকারে উঠে এসেছে  তাঁর লেখালেখি লেখালেখি নিয়ে অনেক মূল্যবান কিছু কথা। যা পৃথিবীর সকল লেখক ও পাঠকদের জন্য সাহিত্যের নতুন ভাবনার যোগান হতে পারে।

সম্প্রতি তাঁর প্রকাশিত বই “কিলিং কমেন্ডেটর” সম্পর্কে তিনি ওই সাক্ষাতকারে বলেছেন, “আমি মনের ভেতর কোথাও একটা তাগিদ অনুভব করছিলাম তীব্রভাবে ৷ সর্বপ্রথম যখন এক দুই প্যারা লিখে ফেলেছি,তখনো জানিনা এটা কোন দিকে যাচ্ছে ৷ এমন কি টেবিলে,ড্রয়ারবন্দী ছিল এই লেখাগুলো ৷ কারন এগুলো দিয়ে কি করতে হবে আমি জানতামনা ৷ এরপর, একদিন মনে হল সম্ভবত এমন একটা আইডিয়া খুঁজে পেয়েছি,যার ভেতর দিয়ে লেখা আগানো যেতে পারে ৷ তারপর শুধু একটানা লিখে গিয়েছি৷ আসলে সবকিছুরই একটা সময় আছে ৷ তুমি যদি সত্যিকার অর্থেই সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করো,এটি তোমার কাছে আসতে বাধ্য ৷ তুমি যে হঠাৎ করে একটা আইডিয়া পেয়ে যেতে পারো, এই বিশ্বাসটুকু নিজের উপর রাখতে হবে৷ আমার নিজের উপর এই আত্মবিশ্বাসটা আছে৷ কারন, আমি ৪০ বছর ধরে লিখছি। আমি জানি কিভাবে অপেক্ষা করতে হয় ৷

আমি যখন নিজের জন্য লিখি না, তখন অনুবাদ নিয়ে পড়ে থাকি ৷ সেই যে অপেক্ষাটার কথা বলছিলাম, সে অপেক্ষাকালীন সময়টায় অনুবাদের চেয়ে ভালো কোন কাজ হতেই পারেনা ৷ খেয়াল করে দেখো, আমি যখন বলছি আমি অপেক্ষারত, আমি কিন্তু তখনও লিখেই চলেছি; কিন্তু সেটা আমার নিজের কোন উপন্যাস নয়৷ তো এই শ্রম আমার কাছে অনেকটা “সেলফ ট্রেনিং” এর মত৷ আমি একজন জগিং করা, গান শোনা, প্রতিদিন ঘরের কাজ করা সাধারন লোক ৷ নিজের শার্টটা নিজে ইস্ত্রি করতে ভাল লাগে আমার৷ লেখালেখি করি বলে মেজাজ সবসময় সপ্তমে রাখতে হবে, এমন দিব্যি তো কেউ দেয়নি ৷ আমার লিখতে বেশ মজাই লাগে আসলে ৷”

নিজের বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া বা সমালোচনা সম্পর্কে মুকারামি বলেন, “তুমি সাধারনত লেখকদের এই প্রশ্নটা করলেই তারা তোমাকে বলবে, ‘আমি দেখিনা’, কিন্তু এটা একটা নির্জলা মিথ্যা কথা ৷ আমার স্ত্রী আমার সব সমালোচনা আর রিভিউগুলো দেখেন,পড়েন ৷ বাজে রিভিউগুলো সে নিয়ম করে আমাকে জোড়ে জোড়ে পড়ে শোনায় ৷ সে আমাকে একটা কথা প্রায়শই বলে, ভালো সমালোচনা, রিভিউগুলো একদম ভুলে গিয়ে কেবল নেগেটিভ রিভিউ আর বাজে সমালোচনাগুলো গ্রহণ করবার মানসিকতা রাখতে  হবে৷”

নিজের ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর লেখা চরিত্রগুলোর ছাপ পড়ে কিনা এই প্রশ্নে মুকারামি বলেন, “ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ৷ বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই আমার সমস্ত জীবন যাপন৷ আমার ধারনা, প্রত্যেকের মনের ভিতরেই কিছু কিছু আজব জায়গা আছে ৷ ফিকশন যখন লিখি,তখন বেশিরভাগ সময়টাতেই আমার নিজের সেই আজব ও কল্পনায় ঘেরা পৃথিবীটায় ঘুরে বেড়াই ৷ এইটা আসলে অনেকটা নিজেকে খোঁজার মত ৷ চোখ বন্ধ করলেই আমি নিজের ভেতরের সেই পৃথিবীটাকে দেখি, নিজেকে খুঁজে পাই৷ যে কেউই হয়তো পায়৷ মনে মনে নিজের ভেতরের অপিরিচিত কানাগলি দিয়ে হাঁটা লোকজনের অভাব নেই পৃথিবীতে৷ আমি যেমন যাই, তেমন করেই ফিরে আসার চেষ্টা করি ৷ যাওয়াটা ঠিক আছে, এই ক্ষেত্রে ফেরাটাই সবচেয়ে জরুরী ৷

আরও পড়ুনঃ মনুষ্যবিহীন ভয়ংকর আকাশযান বা যুদ্ধড্রোন

মুকারামিকে প্রশ্ন করা হয়, নিজের বই সম্পর্কে অন্যেকে ব্যাখ্যা দিতে তাঁর কেমন লাগে। উত্তরে গুণী এই লেখক বলেন, “মানুষজন প্রায়শই আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এটার মানে কি? অমুক বইয়ে এটা দ্বারা কি বোঝাতে চেয়েছেন?’ আমি কোন উত্তরই দিতে পারিনা৷ কারণ, আমি জানিইনা এইসব কিভাবে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে হয়৷ আমি আমার যে কথা বইয়ে লিখেছি তা কিন্তু রূপকার্থে অনেকটা পৃথিবীর কথা লেখার মতই৷ একটা রূপক,মানে মেটাফরকে তো আর বিশ্লেষণ করা যায়না৷ আমি যা লিখেছি, তা তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে না, তবে মেনে নিতে হবে।

নিজের স্বপ্ন নিয়ে মুকারামি বলেন, লেখকরা যেহেতু লিখতে পারেন, তাই তাদের আলাদা করে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন নেই।