হোয়াকিন ফিনিক্স

হোয়াকিন ফিনিক্স : অস্কারজয়ী এক নায়কের নেপথ্যের ইতিহাস

সম্প্রতি লস এঞ্জেলসের ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসর অস্কার৷ এবারের অস্কার আসরে চারিদিকে ‘প্যারাসাইট’ খ্যাত কোরিয়ানদের দূর্দান্ত প্রতাপ দেখা গেলেও, গোল্ডেন গ্লোব মাতানোর ঠিক পরপরই সমালোচকদের ভবিষ্যৎবানীকে সত্যে পরিণত করেছেন বিখ্যাত অভিনেতা হোয়াকিন ফিনিক্স ৷ “জোকার” চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য এই বছরের সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়ে প্রথমবারের মত একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জনের স্বাদ পেয়েছেন মেধাবী এই অভিনেতা৷ আজ আমরা জানাবো এই অভিনেতার অজানা গল্প।

ছেলেবেলা থেকেই শিপ্লের বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী এই আমেরিকান অভিনেতার ধীরে ধীরে আজকের অবস্থানে পৌঁছানোটাও অনেকটা সিনেমার দৃশ্যের মতই ৷ হোয়াকিন ফিনিক্সের বৈচিত্র্যময় জীবন আপনাকে বাধ্য করবে তাঁকে নতুন করে চিনতে, জানতে ও ভাবতে।

আর আট দশটা শিশুর মত সুন্দর, ছবির মত গোছানো শৈশব ছিলনা ফিনিক্সের ৷ ফিনিক্সের পিতা-মাতা  “চিল্ড্রেন অফ গড” নামের একটি মিশনারী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন ৷ ধর্মীয় মিশনারী এই সংগঠনটির নামে আধ্যাত্মবাদ চর্চার নামে পতিতাবৃত্তির অভিযোগ ছিল ৷ ফিনিক্সের বাবা-মা ধর্ম চর্চার জন্য গোটা আমেরিকা চষে বেড়িয়েছেন একটা সময় ৷ তাই বলা যায়, ফিনিক্সের ছেলেবেলা কেটেছে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়িয়ে। এই মেধাবী অভিনেতার প্রথম পারিবারিক নাম ছিল হোয়াকিন রাফায়েল বটম ৷ “চিল্ড্রেন অফ গডে”র ফাঁকিটা বুঝতে পেরে আমেরিকায় এসে পাকাপাকিভাবে স্থায়ী হওয়া বটম ফ্যামিলি পারিবারিকভাবেই “ফিনিক্স” উপাধি গ্রহন করে ৷

শৈশব থেকেই দারিদ্রতা পিছু ছাড়েনি “ফিনিক্স” পরিবারের ৷ ফিনিক্সরা মোট পাঁচ ভাইবোন ৷ এমনও এক সময় ছিলো, যখন দক্ষিণ হলিউড এলাকায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বড়ভাই রিভারের সাথে বিটলসের গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছে হোয়াকিন ফিনিক্সকে ৷ তবে, শিল্প সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ দেখে ফিনিক্সের পিতামাতা শৈশবেই ছেলেমেয়েদেরকে স্থানীয় ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগীতায় নাম লেখাতে পাঠিয়েছিলেন৷ পরবর্তীতে হোয়াকিন ফিনিক্স ছাড়াও তার বড়ভাই রিভার এবং বড়বোন রেইন যথাক্রমে অভিনয় ও সংগীতে নাম করেছিলেন ৷

ফিনিক্স, তার বড়ভাই রিভারের অভিনয়ের ভক্ত ছিল৷ রিভারও ছোটভাইকে দারুন ভালবাসতেন৷ রিভার ছিলেন দূর্দান্ত অভিনেতা৷ ছোট্ট ফিনিক্সকে তিনিই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলেন ৷ দূর্ভাগ্যবশঃত অতিরিক্ত মাদকের প্রভাবে রিভার পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অত্যন্ত অল্প বয়সে ৷ একটি নাইটক্লাবে রিভার যখন হঠাৎ অসুস্থ অনুভব করতে শুরু করেন তখন ছোটভাই হোয়াকিন ফিনিক্স তার সাথেই ছিল ৷ মৃত্যুর হাত থেকে ভাইকে বাঁচাতে ফিনিক্সের ইমার্জেন্সি সার্ভিসে কল করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য আকুল প্রচেষ্টার সিসিটিভি ফুটেজ কোন না কোনভাবে প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল সেসময় ৷ সেদিন এইরকম দৃশ্য দেখে বিশ্ববাসী একদম হকচকিয়ে গিয়েছিল ৷ হোয়াকিন ফিনিক্সকে একজন সত্যিকারের জীবনযোদ্ধা বললে কিছু কম বলা হবে না।

ফিনিক্স অনেক অল্প বয়স থেকেই ক্যামেরার সামনে কাজ করতে শুরু করেছিলেন ৷ যদিও একদম শুরুতেই বাজিমাত করে ফেলেননি তিনি৷ যত দিন গিয়েছে, একটু একটু করে নিজেকে আজকের অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছেন ফিনিক্স৷ এর আগে “গ্লাডিয়েটর” চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম অস্কার নমিনেশন পান তিনি ৷ কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী জনি ক্যাশ এর বায়োপিক “ওয়াক দ্য লাইনে” অভিনয় করেও অস্কার নমিনেশন পেয়েছিলেন তিনি। সেই বছর গোল্ডেন গ্লোব এওয়ার্ড অর্জন করেন ফিনিক্স ৷ 

হোয়াকিন ফিনিক্সকে পর্দায় যেমন অনুভূতিপ্রবণ নায়ক হিসেবে দর্শকরা আবিষ্কার করেন, বাস্তবেও অনেকটাই তেমনই এই মানুষটি ৷ ফিনিক্সের সাথে ,রুনি ম্যারার পরিচয় হয় “হার” সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় ৷ ২০১৬ সালে “ম্যারি মাগদালেন” চলচ্চিত্রের শ্যুটিংয়ে ঘনিষ্ট হতে শুরু করেন তারা ৷ ২০১৭ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে রুনি ম্যারার সাথে জুটি হয়ে লাল গালিচায় হাঁটার পর থেকে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন দু’জন ৷ ২০১৯ সালে এংগেজমেন্ট সেরে এখন পর্যন্ত হলিউডের অন্যতম সুখী জুটির উদাহরণ ফিনিক্স-ম্যারা জুটি ৷

আরোও পড়ুনঃ জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির সাক্ষাতকার

ফিনিক্স পরিবারে ছোট বয়স থেকেই অধিকার সচেতনতার শিক্ষা পেয়েছেন হোয়াকিন ফিনিক্স ৷ তাইতো, অধিকারের প্রশ্নে সবসময় তাকে সরব হয়ে উঠতে দেখা যায় বিশ্ব মিডিয়ায় ৷ অস্কার হাতে নিয়ে দর্শকের সামনে তার বক্তব্যও এমন কিছুরই আভাস দিয়েছিলো। জলবায়ু বিপর্যয় রোধে ফিনিক্স সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ রক্ষাকারী আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতারও হয়েছিলেন ৷ 

অভিনয়ের প্রতি ফিনিক্সের ত্যাগ ও পরিশ্রম কোন পর্যায়ের তা দেখে অবাক হতে হয়। একদম সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা, দারিত্রতার সাথে যুদ্ধ করে বেড়ে ওঠা ফিনিক্স বলেন, “দিন শেষে অভিনয় নিয়েই আমাকে ভাবতে হয় ৷” একজন হোয়াকিন ফিনিক্সকে, বিশ্ববাসী হয়তো এ কারনেই এত সহজে ভুলে যাবেননা ৷

Check Also

মেরিলিন মনরোর মেকআপ

মেরিলিন মনরোর মেকআপ রহস্য!

মেরিলিন মনরো, শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রী। এখনও যার নাম মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত …