অ্যালিসা কারসনঃ ২০৩৩ সালে মঙ্গল গ্রহে চলে যাবেন যে নারী!

অ্যালিসা কারসন

কেমন হতো, যদি আপনাকে জানানো হতো যে, আপনি আর কখনোই আপনার পরিবারকে দেখতে পাবেন না? আর শুধু পরিবার নয়। এই তালিকায় আছে পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ। আপনি যতদিন বাঁচবেন, আপনার পাশে আর কোন প্রাণ খুঁজে পাবেন না আপনি। কেমন লাগছে ভাবতে?

১৯ বছর বয়সী অ্যালিসা কারসন কিন্তু পুরো ব্যাপারটিকে বেশ উপভোগ করছেন। আর করবেন নাই-বা কেন? তাকে তো জোর করে এমনটা করতে বলা হয়নি। বরং, এলিসা নিজেই নিজের জীবনের এই গতিপথ বেছে নিয়েছেন! বলছিলাম সম্প্রতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া নাসার কিশোরী অ্যালিসার কথা। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০৩৩ সালে মহাকাশযানে করে মঙ্গল গ্রহে যাবেন এই কিশোরী। আর সেটাও নভোচারী হয়ে নয়। বরং, সেখানকার বাসিন্দা হয়ে।

কী আছে মঙ্গল গ্রহে? এতদিন পর্যন্ত কিছু নভোচারীর প্রদান করা তথ্য, স্যাটেলাইট এবং নানা মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের উপরেই নির্ভরশীল ছিলো পৃথিবীর মানুষ মঙ্গল গ্রহকে জানতে। তবে অ্যালিসা মঙ্গল সম্পর্কে মানুষকে পুরোটা জানাতেই যাচ্ছে এবার। কোথা থেকে এলো এই অ্যালিসা? নাসা আর সবাইকে বাদ দিয়ে এই ছোট্ট মেয়েটাকেই কেন বেছে নিতে গেলো এই ভয়ংকর কাজের জন্য? চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেই গল্পটা।

কবে থেকে এই গল্পের শুরু? 

অ্যালিসার মঙ্গলে যাওয়ার গল্পটা শুরু হয়েছিলো ২০১৫ সালে। সেই বছর নাসার কাছ থেকে অফিসিয়ালি একটি আমন্ত্রণপত্র পায় এই ছোট্ট মেয়েটি। নভোচারী হওয়ার ইচ্ছে ছিলো তাঁর সবসময়য়। মহাকাশের প্রতি ছিলো অসীম আগ্রহ। তাই এই সুযোগ পাওয়ার পর আর মানা করেনি অ্যালিসা। 

২০০১ সালের ১০ই মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের লুজিয়ানা রাজ্যের হ্যামন্ডে জন্ম নেয় সে। বাবা বের্ট লারসন অনেক আগে থেকেই মহাকাশ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। এসবই ছিলো তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। মেয়েকেও তিনি ঠিক নিজের মতো করেই গড়ে তোলেন তিনি। একটু একটু করে পৃথিবীর বাইরে যাওয়ার ইচ্ছেটা মাথাচরা দিয়ে ওঠে বাবা-মেয়ের।  অ্যালিসার অবশ্য মঙ্গল গ্রহ নিয়ে এমন আগ্রহের আরেকটি কারণ ছিলো কার্টুন। কার্টুন সিরিজ ‘The Backyardigans’ তখন নিয়মিত দেখত অ্যালিসা। সেখানেই একটি পর্বে দেখানো হয় যে, কয়েকজন বন্ধু মিলে মঙ্গল গ্রহে ঘুরতে যাচ্ছে কল্পনায়। ঠিক সেই সময়েই বাবার কাছে বায়না ধরে অ্যালিসা যে সেও যাবে ঐ লাল মঙ্গল গ্রহে। তাও আবার বাস্তবে, কল্পনায় নয়। 

বাবা মেয়েকে না করতে পারে না। তবে বাবা আর অ্যালিসা দুজনেই জানতো, এই পথটা মোটেও খুব একটা সহজ নয়। অ্যালিসার বয়স তখন সাত বছর। বাবার সাথে আলাবামার হান্টসভিলেতে একটি স্পেস ক্যাম্পে ঘুরতে যায় সে। আর সেখানেই অ্যালিসা অনেক কথা জানতে পারে। তাঁর মনে অনেক প্রশ্ন ছিলো আগে থেকেই। সেগুলোর উত্তর পায়। তবে তাঁর মনে একের পর এক নতুন প্রশ্ন জাগতে থাকে। 

মহাকাশ সম্পর্কে জানতে হলে তাকে নাসায় যেতে হবে। এটা বোঝার পরই জোর চেষ্টা চালায় অ্যালিসা। ২০১৩ সালে তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়। সে বছরের ৯ই অক্টোবর নাসার সবগুলো ভিজিটর ক্যাম্পে প্রবেশের পাসপোর্ট পায় সে। তখন তাঁর বয়স ১২। সেই বয়সে এমন অর্জন ছিলো অনেকটা রেকর্ডের মতো। বিশেষ করে, তখন পর্যন্ত এতো কমবয়সী কেউ নাসায় ভিজিটর হিসেবে আসার অনুমতি পায়নি। একে একে সে কানাডা এবং তুরস্কেও ক্যাম্প পরিদর্শনে যায়। একটু একটু করে তাকে সবাই চিনতে শুরু করে। মোট ১৮টি ক্যাম্প ঘোরা তখন শেষ অ্যালিসার। নাসার সবাই অ্যালিসাকে পছন্দ করতে শুরু করে। 

একটু একটু করে নিজের আগ্রহের জায়গাতে পৌঁছতে পারে অ্যালিসা। তাকে মঙ্গল অভিযানের অংশ করে নেওয়া হয়। কিন্তু নাসার নভোচারী হওয়ার জন্য ১৮ বছর বয়স অতিক্রম করতে হয়! সেই ব্যাপারটিকে মাথায় রেখেই অ্যালিসা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। মাইক্রোগ্র্যাভিটি, অক্সিজেনের অভাবে দেহের পরিবর্তন, পানির নিচে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শূন্যতায় ভাসা- এমন নানাবিধ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করছে সে। এখন তাঁর বয়স ১৯ বছর। না কোন ভালোবাসার সম্পর্ক, না বিয়ে করতে পারবে সে। নিজের স্বপ্ন, মঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে এই কিশোরী। সত্যিই তো! স্বপ্নের চেয়ে বড় আর কী হতে পারে!

নাসার পাশাপাশি অবহস্য পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাচ্ছে সে। স্কুলে সাধারণ পড়াশোনার পাশাপাশি মোট চার রকমের ভাষা আয়ত্ব করেছে অ্যালিসা। কথা বলতে খুব ভালোবাসে সে। তাই পাবলিক স্পিকার হিসেবে কাজ করে সে অবসর সময়ে। 

মঙ্গলে গিয়ে কী করবে অ্যালিসা?

মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য এখনো নেই মানুষের কাছে। সেই তথ্যগুলোই দেওয়ার চেষ্টা করবে আলিসা মঙ্গলে গিয়ে। নানারকম প্রমাণের খোজ, এক্সপ্লোরেশন, ট্রি প্ল্যান্টেশন, মাটি পরীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে এই তথ্যগুলো পাবে সে। আর এই পুরোটা কাজ তাকে করতে হবে একা। 

মঙ্গল গ্রহে মানুষের টিকে থাকা কি সম্ভব?

অবশ্যই সম্ভব। ১৯৬৯ সালে যে প্রযুক্তি মানুষের কাছে ছিলো, সেটা দিয়েই সে মঙ্গল গ্রহে থাকতে পারতো সে, এমনটাই মনে করেন ক্রিস হ্যাডফিল্ড নামের এক কানাডিয়ান নভোচারী। তবে এখানে একটাই আশংকা থাকে। আর সেটা হলো, নভোচারীদের মৃত্যুর আশংকা। মহাশূন্যে অনেকটা সময় থাকার ফলে মানুষের শরীরের যেকোনো সময় একটি বিশেষ রকমের ক্যান্সার জন্ম নিতে পারে। আর সেখান থেকে একজন মানুষের মৃত্যুও ঘটতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটা বহু যুগ আগে পৃথিবীর সবখানে ঘুরে আসা পরিব্রাজকদের মতো। তাঁরা জানতেন না কোথায় যাচ্ছেন। যাওয়ার প্রবল আগ্রহ থেকে পুরটা পৃথিবী ঘুরেছেন তাঁরা। কিন্তু সবাই সেখানে টিকতে পারেননি। সেই যাত্রায় মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষেরই।  অবশ্য মঙ্গল নিয়ে এতোটা চিন্তার কিছু নেই বলে মনে করছেন সবাই। ইতিমধ্যে এলন মাস্ক নতুন স্পেসশিপ তৈরি করেছেন যেটি দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে একজন মানুষ মঙ্গলে যেতে পারবে। সেটির মাধ্যমে মঙ্গলে গেলে, এরপর ২০৩৩ সাল পর্যন্ত আমাদের হাতে আসা সবগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করলে নিশ্চয়ই ভালো কিছু আশা করা যাবে এমনটাই ভাবছেন সবাই।

কিছুদিন আগেই মঙ্গলের ২০ কিলোমিটার স্থান জুড়ে এক কিলোমিটার গভীরে পানির অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। অনেকে ভাবছেন এই পানি বরফ গলে জন্ম নিয়েছে। এই পানির তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৬৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তারমানে, মঙ্গলের গভীরে কোথাও না কোথাও পানির অস্তিত্ব রয়েছে। আর পানির অস্তিত্ব মানেই প্রাণের সম্ভাবনা। সবমিলিয়ে মঙ্গলকে দ্বিতীয় পৃথিবী হিসেবে তৈরি করার স্বপ্ন দেখছে এখন মানুষ। প্রতি ১৫ বছর পরপর পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহ একে অন্যের কাছে আসে। ২০৩৩ সাল এমনই একটি বছর। আর সেই বছরেই অ্যালিসাকে মঙ্গলে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে নাসা।

২০৩৩ সালে অ্যালিসার বয়স হবে ৩২ বছর। আর কখনো পৃথিবীতে ফিরে আসবেন কিনা জানেন না এই কিশোরী। নাসা চেষ্টা করবে তাকে ফিরিয়ে আনার। মঙ্গল গ্রহ থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করতে চান এই কিশোরী।

লেখিকাঃ সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

Check Also

মুসলিম বিজ্ঞানী – ‘আল বাত্তানী’

সাইন কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক অথবা একটি ত্রিভুজের বাহুর সাথে তার কোণের  যে সম্পর্ক বিদ্যমান …